গ্লাস হাতে কেঁদেছ কোনদিন, শতদ্রু? অবনী সেন কেঁদেছিলেন সেদিন রাতে রঞ্জনা কোথায় চলে গেল, কোথায় থাকল, কেন এক মুহূর্তের জন্য তিনি সহজ হলেন না এসব কথা ভেবে, আর ওর লেখা বৃষ্টি দেখেছি গানটা রাত জেগে ঠিক করতে করতে। অথচ দেখো, কথা বদলে দিলেও উনি বক্তব্যের সাথে একটুও কম্প্রোমাইজ করেননি।
আমরা কি করছি বল? সব তাড়াতাড়ি করে ফেলছি। সবটাই এক্ষুনি করতে হবে, এর মধ্যে করতে হবে। আমাদের আশপাশের লোকজন,সময়, অফিস, ব্যবসা, শহর জুড়ে তৈরি হওয়া হাইরাইজ - সবকিছুই এখন তাৎক্ষণিককে বোঝে। Instant gratification. তাই কাল ঘন্টা দেড়েকের কিছু বেশি সময়ের আলোচনায় বসে থাকি আমরা জনা ত্রিশ- চল্লিশেক লোক। বাকিরা reels scroll করে যান। YouTube-র নতুন users' traffic statistics খুব শিগগিরই বদলাচ্ছে, শতদ্রু। তুমি দেখে নিও, এরপর এক মিনিটের shorts-ও অনেক প্রলম্বিত মনে হবে। আরও ছোট, আরও জলদি, আরও ease of access চাইব আমরা।
কাল সন্ধ্যেবেলা যারা অঞ্জনদাকে শোনেননি, আমি বলি কি, তারা হয়তো জানতে পারলেন না যে এক অঞ্জন দত্তের মধ্যে কতগুলো বিপুল অঞ্জন দত্ত রয়েছেন। একটা সমগ্রকে নিয়ে যাঁরা চলেন, তাদের কথায় থেকে যায় বিষয়ের fluidity- এক কথা থেকে পারস্পরিক সম্পর্কিত অনেকগুলো বিষয়কে একটা মুহূর্তে তাঁরা ধরে ফেলতে চান। সেই পরিচিত অকপট অঞ্জন দত্তের কাছাকাছি বসে ছিলাম আমরা কয়েকজন কাল সন্ধ্যেবেলা, যাদের সামনে তিনি বলতে পারেন - 'এই পেজটায় আমাকে লোকজন ভুল বোঝেন না। তাই এত খোলাখুলি অনেক কথা বলে দিতে পারি।'
কী বললেন জানতে চাইছো কি? না, শতদ্রু। হাসপাতাল থেকে ফেরো। তারপর না হয় অন্য কোন লাইভে অন্যভাবে শুনবে? অসুস্থ মুখে একটু স্যুপ খেতে খেতে, স্নানঘর থেকে উঁকি মেরে বা বিছানায় ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে ওঁকে না হয় নাই বা শুনলে! স্বর্গরাজ্য হতে না পারা দুনিয়ায় যে কতিপয় কয়েকজন আমরা একটা সুস্থ পৃথিবীর স্বপ্ন দেখছি প্রতিদিনের ময়লা ঘাঁটতে ঘাঁটতে, সেই সুস্থতার কাছাকাছি বসে সময় দিয়ে, বোধ দিয়ে, বিষন্নতা দিয়ে, নতুন বা অন্য কিছু শুধু এক্সপেরিমেন্ট করার জন্য নয় বরং আমার দর্শককে আমি নতুন কিছু দেবো এই তাগিদের বা অঙ্গীকারের জায়গা থেকে বলা অনেকগুলো আত্মকথনের মধ্যে তিনটি বিষয় কাল আমারচমৎকার লেগেছে। রঞ্জনাকে যেমন অবনী সেন বলেছিলেন, "সবাই যেটা বলতে পারছে না, বলতে চাইছে, তুমি সেটা দুম করে বলে ফেললে" কিংবা Alexander Pope এর সেই কথা "What oft was thought, but ne'er so well express'd" - কাল তেমনটাই করলেন অঞ্জন দা। মনে হল- আরে? এ কথা তো আমিও কতবার বন্ধুদের আড্ডায় বলতে চেয়েছি; কিন্তু এত গুছিয়ে বলতে পেরেছি কি?
প্রথম কথা, আমরা মন দিয়ে হোমওয়ার্ক করতে ভুলে যাচ্ছি। তিন মাসে ফরাসি শিক্ষা, ছ'মাস গান শিখে তারপরই রিয়েলিটি শোতে মুখ দেখিয়ে গায়ক হওয়া, job-ready professional crash course, goal oriented আর process oriented হওয়ার টানাপোড়েন - এই সব মিলে আমরা শিখছি কতটুকু? তোমাকে বলেছিলাম মনে আছে, এই সমস্যাটা সমস্ত কাজের ক্ষেত্রেই। অন্তত, যেসব কাজের একটা বহিরঙ্গের আভিজাত্য আছে সেটা দেখে অনেকে শুরু তো করে ফেলে, এটা না বুঝেই জনপ্রিয়তার জায়গাটা পৌঁছানোর কোন cut and dried formula নেই বরং আছে একটা দীর্ঘপথ পেরোনো অন্তহীন একই কাজের repetitive cycle মেনে নেওয়া, সেটাকে নিয়ে প্রত্যেক মুহূর্তে নিজের কাছে সৎ থাকা এবং কখনও বা নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও নিজেকে করতে বাধ্য করা - এই নিয়মানুবর্তিতা না থাকলে এটা সম্ভব নয়। এ সমস্যা আমি নিজে ফরাসি ভাষা এবং গান শেখাতে শেখাতে গিয়ে এই জায়গার সামনে দাঁড়িয়েছি বহুবার। "Learning French is so cool" কিংবা বেশ কিছু লোকজনকে টেলিভিশন বা স্টেজে মুখ দেখাতে পারব - এই ভেবে শেখা তো অনেকেই শুরু করে দিচ্ছে, কিন্তু তারপর দেড় দু'মাসের বেশি মোহ ভাঙতে সময় লাগছে না কারণ এসব কাজে পরিশ্রমের জায়গাটা মারাত্মক। আবার অনেকে ভুল জায়গায় পরিশ্রম করছে হয়তো? Tim Ferris লিখেছিলেন মনে আছে, "Doing something unimportant well doesn't make it important." এ কথা কি একটা ভুল কাজ ভালোভাবে করতে থাকার ক্ষেত্রেও সত্যি নয়?
দ্বিতীয় বিষয়টা আরও মারাত্মক। একথা "অঞ্জনযাত্রা" বইতেও অঞ্জনদার কথাতেই অন্যভাবে শুনেছি যে, যারা একটা বিখ্যাত হতে পারার মনকে যত্ন করে তৈরি করতে পারেন না, তারা রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলে সেই খ্যাতির ওজনটাও ঠিক সামলে উঠতে পারেন না। "A rich man is thinking like a lumpen." - এই সময়ের অন্যতম বড় একটা ক্রাইসিস, শতদ্রু। রাতারাতি লোকে বড়লোক হয়ে যাচ্ছে, কাঁচা টাকা পাচ্ছে হাতে, চাইলেই একটু বিয়ার খেয়ে গা এলিয়ে দিতে পারছে ইনসিগনিয়া ক্লাসে। আর তাতেই বাঁধছে গন্ডগোল। একটা qualitative degeneration হচ্ছে আমাদের চারপাশের সবকিছুতে। তাই ইনসিগনিয়াতেও একটা সিনেমা দেখতে দেখতে বেজে উঠছে বারবার মোবাইল ফোন, খাবারের দাম নিয়ে ঝামেলা করছেন কিছু মানুষ হলের কর্মীর সাথে,সিটের কোনায় পপকর্ণ গুঁজে দিচ্ছেন, পুজোয় প্যান্টালুন্সে লাইনে দাঁড়িয়ে ধাক্কাধাক্কি করছেন আগে বিল করা নিয়ে, অথবা একটা এক্সট্রা ক্যারি ব্যাগের জন্য মারামারি করছেন। অর্থাৎ পকেট ফুলে উঠছে, কিন্তু নিজের দর্শন ও নিজস্বতার ভাষাগুলোর, অভ্যেসগুলোর বিবর্তন হচ্ছে না। তোমাকে বলেছিলাম শতদ্রু মনে আছে, সবকিছু সহজে ছুঁতে পারলে, সবাই সবকিছু করতে পারলে - একটা ভালো জিনিসকে হাতে পাওয়ার গুরুত্বটাই খাটো হয়ে যায়। একজন বড় মাপের অভিনেতা যদি কাল রাতারাতি তোমার রুমমেট হয়ে যান, তাহলে তুমি হয়তো শুধু ফেসবুকেই বলবে "দেখো, লোকটা কি ডাউন টু আর্থ" কিন্তু বুকে হাত রেখে বল, তুমি কি তাকে আগের মতই সম্ভ্রমের চোখে দেখবে?
আর কি বললেন অঞ্জন দা? অভিনেতার চোখের কথা, চোখের বিষন্নতার কথা, একজন অভিনেতার কথা মাথায় রেখে এক একটা চরিত্র তৈরি করা কিংবা এক অভিনেতার একটা জলজ্যান্ত,আস্ত, চরিত্রের সমস্ত দিকগুলো নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারার কথা। এ সমস্ত অনেক গল্প হল কাল। আরও অনেক কিছু, শতদ্রু। সে কথা বলব না; আর কেন বলব না সেটা বলেছি।
আমি সত্তরের কলকাতায় বেড়ে উঠিনি, শতদ্রু। কিন্তু আমি অঞ্জন দত্তকে দেখেছি। অঞ্জন দত্তের নাটকে, গানে,সিনেমা কিংবা ইন্টারভিউতে দেখতে পেয়েছি কলকাতার মধ্যে কত উনুন, একটা প্রজন্মের বড় হয়ে ওঠা এবং অন্য প্রজন্মের কাছে কীভাবে সমসাময়িক হয়ে থাকতে হয়। গ্যালিলিও বা সেলসম্যানের সংসার দেখে পরের দিন ফেসবুকে ঋদ্ধি সেনের লেখায় পড়েছি- অঞ্জন দত্তকে দেখে কীভাবে অভিনয় করতে হয়, শিখুন।
আমাকে কী শেখালেন অঞ্জন দত্ত? অজান্তেই, একদিনও সামনে না বসেই সবসময় বলে যাচ্ছেন আমাকে চুপি চুপি, ' একজন flaneur হয়ে উঠতে শেখো'। দেখো, 'ভাবা প্র্যাকটিস করো', মিডিয়োক্রিটি ছেড়ে বের হতেই হবে। সিনেমাকে,গানকে, সাহিত্যকে আরও অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে বুঝতে শেখ। একটা সিনেমা ভালো লাগছে? কেন ভালো লাগছে? ভালো লাগছে না? কেন ভালো লাগছে না? এই সমস্ত জায়গাটাকে গুছিয়ে বলতে পারাটা কোন আঁতলামো নয়, একটা ন্যূনতম প্রয়োজন।
জানো, ওঁর বাড়ির আশেপাশে ঘুরে ঘুরে কত দিন চলে এসেছি। সবার তো সব ইচ্ছে পূর্ণ হয়না। হয়ত কোনদিন দেখা হবে ; হয়ত কোনদিনও হবেনা। তবে যে গুটিকয়েক মানুষের কাছে প্রত্যেকদিন জীবন শিখছি তারমধ্যে অবশ্যই অঞ্জন দত্ত সব সময় জুড়ে আছেন।
তুমি তাড়াতাড়ি হাসপাতাল থেকে ফেরো। আমরা এ বছরেই অঞ্জনদার পরের কনসার্ট একসাথে শুনতে যাব, কেমন?
13 July, 2022
Comments
Post a Comment