Skip to main content

বাংলাতে বৌদ্ধিক শিল্পচর্চা হয় নি

 সারাবছরই নানা প্রসঙ্গে নিজের পরিচিতমহলে এই কথাটা বলি। গতকালই ফেসবুকে আমার একজন প্রিয় ভাষাশিল্পী, যিনি আদ্যোপান্ত আমারই মত একজন flaneur, চর্বিত-চর্বণের মত বলছিলেন ভাষা-সংস্কৃতি ও উত্তরাধিকারের বদলে যাওয়ার নানা কারণ। ওঁর লেখায় বারবার উঠে এসেছে একদিকে বাঙালিয়ানা আর অন্যদিকে কলকাতার নিজস্বতা কীভাবে বহুজাতিক সংস্থাগুলোর খপ্পরে পড়ে গত কয়েক দশকে ধীরে ধীরে এক 'সাংস্কৃতিক দেউলিয়া' (cultural bankrupcy) হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে। অনেক তলিয়ে ভেবে তাঁর এটা মনে হয়েছে যে, এর পেছনে একদল শিল্পী, সাহিত্যিক এবং সংযোগমাধ্যমের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য প্রবলভাবে কাজ করেছে; শেষমেষ এরাই জিতে গেছেন।

ভাষা দিবস এলে অনেকেই কথাগুলো বলেন; হয়ত এতটা গুছিয়ে বলতে পারেন না - প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন কিছু চটকদারি দুই লাইন, মিমস্, রিলস্ ইত্যাদি। কিন্তু বলেন। একদল গুছিয়ে বলেন আর একদল অন্যেরা বলেছে বলে সংযোগ বিস্তারকে (network effect) জোরদার করতে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদি মাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার প্রয়োজনীয়তার তাগিদে বলেন। কিন্তু কেউ 'কেন এটা হয়েছে'- সত্যিই ভেবে বলেন কি? একদল বণিকগোষ্ঠীর মানুষ ঢুকে রাতারাতি একটা সাংস্কৃতিক লুণ্ঠন চালানো, খুবই সম্ভব ঐতিহাসিক কারণেই, কিন্তু কোনো প্রতিরোধ হলো না কেন?
শুনতে খারাপ হলেও, এর কারণ রয়েছে বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতির বিবর্তনের মধ্যেই। পৃথিবীতে যে সব ভাষা, সংস্কৃতি বা গোষ্ঠী লুপ্ত হয়ে গিয়েছে তাদের মূলত দুটি জিনিস ছিল না - রাজনৈতিক ক্ষমতা অথবা সাংস্কৃতিক নিজস্বতার ঔৎকর্ষ্য। বাংলা ভাষার ইতিহাস সুলতানী আমল কিংবা তার একটু পর চর্যাপদের উৎপত্তি থেকে মোঘল আমলের শেষে ভারতচন্দ্র রায়ের হাতে ভাষার পূর্ণতা প্রাপ্তি এবং পরবর্তীতে বিদ্যাসাগর, মাইকেল হয়ে রবীন্দ্রনাথ জীবনানন্দ অবধি যদি দেখা যায়, তাহলে ভারতের অন্যান্য ভাষাগোষ্ঠীর তুলনায় আমরা রাজনৈতিক প্রতিপত্তিতে পিছিয়ে ছিলাম এ বোধহয় কোন ভাবেই বলা সম্ভব নয়। আমার মতে কারণটি তাই দ্বিতীয় - নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঔৎকর্ষ্যের অনুপস্থিতি।
ভাষার দিক থেকেই দেখুন না। বাংলার নিজস্ব শব্দভাণ্ডার নেই। নেই! কোন দিনও ছিল না। তৎসম, তদ্ভব (যা সাধারণ মানুষের উচ্চারণ অক্ষমতা ও বিকৃতি থেকে সংজাত), মিশ্র হোক বা আগন্তুক - সমস্তটাই অন্যের থেকে আমদানিকৃত। ২০২২-এ দাঁড়িয়ে কোন ছেলেমেয়ে তাই যদি "কেন কি" অথবা "তুই আমাকে শক করিস" বলে, তাহলে মোটেই আশ্চর্য হই না। এখানে মনে হতে পারে, পৃথিবীর অনেক ক্ষমতাশীল ভাষাগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও কি তাই নয়? ফরাসি হোক বা ফার্সী, জার্মান বা ইটালিয়ান, পাঞ্জাবী বা মারাঠী এইসব ভাষা শুধু নিজস্ব শব্দকৌলিন্যের আশ্রয়ে বেঁচে আছে? না; তবে এদের প্রত্যেকের নিজস্ব একটা শব্দকোষ রয়েছে, যা তৈরি হয়েছে নয় ভাষা-সংস্কৃতির স্বকীয়তায়, নয়তো আত্তীকরণে প্রতিটি শব্দ এমন এক নিজস্বতা পেয়েছে যাকে কোনভাবেই তদ্ভব শব্দের উৎপত্তির কারণের সাথে মেলানো যায় না। এদের মধ্যে ব্যতিক্রম অবশ্যই ইংরেজি, যার বাংলার মতোই নিজস্ব শব্দভাণ্ডার প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু ঔপনিবেশিক কারণেই এর প্রতাপ যে দিন দিন কমছে না,- তা সর্বজনবিদিত।
ছোট করে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলি। শুধু ভাষার শব্দকোষ নয় বরং খেয়াল করলে চোখে পড়বে যে কবিতা, নাটক, গল্পের যে 'খাঁচা'-টা তৈরি হয়েছিল, এমনকি রবীন্দ্রনাথও যখন বাংলাভাষাকে দৌড় করালেন এবং যতিচিহ্নের সংহতি আনলেন, তাও মূলত ইউরোপীয় ভাষাগুলি বিশেষত ইংরেজীর আদলেই। লোকসংস্কৃতিতে লালন ফকির এবং অন্যান্য অনেকে সমান্তরালে আরেকটি বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতিকে যে সত্যিই লালন করেছিলেন তার চর্চা গবেষকদের বাইরে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে, বিশেষত শহরাঞ্চলে কিন্তু একদমই বহুলপ্রচলিত হয়নি। অর্ক মুখার্জীর মত কেউ কেউ যতই শহুরে বাউল হওয়ার চেষ্টা করুন কিংবা একে নবজাগরণের নাম দিয়ে আধুনিকতার মোড়ক দিয়ে চালান, তা শুধু লুচি আর ছোলার ডালের সাথে রেড ওয়াইন খেতে খেতেই শোনার যোগ্য।
তবে দ্বিতীয় সমস্যাটি (যা এই লেখার শীর্ষ) আরও মারাত্মক এবং বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির নিজস্ব। বাংলাতে বৌদ্ধিক শিল্পচর্চা হয়নি এবং যা কিঞ্চিৎ হয়েছে, তা বাঙালি বেশিদিন গ্রহণ করেনি। কে করলেন বাংলা ভাষায় প্রথম বৌদ্ধিক শিল্পের চর্চা? ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। কেউ পড়ে না আজ। তার পরে? সতীনাথ ভাদুড়ী, কমলকুমার মজুমদার। কারা পড়েন? বাংলা সাম্মানিকের ছাত্ররা, গবেষকরা আর খুব বেশি হলে সারা বাংলায় ষাট থেকে সত্তর জন মানুষ। আমি জাগরী, ঢোঁড়াই বা আনন্দ প্রকাশিত কমলকুমারের "উপন্যাস সমগ্র" কিনে যারা ঘর সাজান, তাদের কথা বলছি না; যদিও তারাও দিন দিন এখন সংখ্যায় অপ্রতুল হয়ে পড়ছেন। চন্দ্রিল ভট্টাচার্যের বাঙালিয়ানা নিয়ে টিপ্পনী নিমেষে ফেসবুকে ছেয়ে যায় কারণ বিষয়টা ভাববার বলে নয়, লীলা মজুমদার এখনও প্রাসঙ্গিক বলে নয়, স্রেফ একজন 'আঁতেল বাঙালি'(যে শব্দবন্ধটি মুখে মুখে ঘোরে) প্রচন্ড নাটকীয় ভাবে harangue করে যাচ্ছেন (দেখুন, এরও একটা জুতসই শব্দ পেলাম না। একথাও শিবনারায়ণ রায় অনেকবার বলে গেছেন) আর ভদ্র ভাষায সবাইকে গালি দিচ্ছেন - এইজন্য। জীবনানন্দকে বাদ দিলে একজনও বৌদ্ধিক চর্চার সাথে যুক্ত কবিদের কবিতা পড়া হয়? সুধীন্দ্রনাথ দত্ত- পড়েন? শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের নামটা জানা। পড়েন? একটা, দুটো বিচ্ছিন্ন কবিতা নয়; কোন একদিন সকালে উঠে মনে হয় যে আজ শ্রীজাত নয়, জয় নয়, অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা পড়ব?
আত্মসংকটে প্রতিরোধ তৈরি হবে, এ তো এক সহজাত সংবেদনের প্রতিবর্ত ক্রিয়া (reflex action)। কিন্তু তার জন্য 'আমি'-কে তো থাকতে হবে। যে আমির ভিত্তিই 'এর থেকে ওর থেকে যা পাওয়া যায়, তাই সই'-এর ওপর, সে অন্য কেউ কাড়তে এলে প্রতিরোধ তো করবেই না, বরং তার স্বাভাবিকতায় অন্যকে নিজের করে নেবে। এ তার মানসিক ঔদার্য্য নয়, এ তার আত্মিক অক্ষমতা। আমরা সেইজন্যেই অন্যের সংস্কৃতি গ্রহণ করেছি বলাটা ভুল; 'অন্য'-টাই আমরা। এই বিভাজন থাকা প্রয়োজন বিচ্ছেদের জন্য নয়, বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্য নয়; প্রয়োজন, সুরক্ষার জন্য। রবার্ট ফ্রস্ট খুব সোজাসাপটা লিখেছিলেন- "Good fences make good neighbors."
আমাদের তাই এক লহমায় অসুবিধা হয় না শিল্পী কবীর সুমনকে সরিয়ে 'মানুষটি অত্যন্ত নোংরা'- এই তকমা লাগাতে। মানুষটির বৌদ্ধিক শিল্পের আমরা প্রতিধ্বনি করেছি, এক কণাও গ্রহণ করিনি। শেখানো বুলি আউড়ে গেছি : "তোমাকে চাই, তোমাকে চাই, তোমাকে চাই..." তিনবার বললে পরের বার আপনিও স্বাভাবিকভাবেই বলবেন, "তোমাকে চাই"। অঞ্জন দত্ত সামাজিক মাধ্যমে বারবার বলে যাচ্ছেন যে মধ্য-মেধা (mediocrity) থেকে বেরিয়ে আসুন, আর তাই তাকে তখন নির্দ্বিধায় ভাবতে হবে একজন নাক-উঁচু(snob) মানুষ হিসাবে। কিছু প্রকাশক, গণমাধ্যম ভাববেন যে অম্লান দত্ত, শিবনারায়ণ রায় বা অরিন্দম চক্রবর্তীর ঘরানায় লেখা বইয়ের এখন বাজারে কাটতি নেই। ওদিকে অলক্ষ্যে চর্চা হবে ঠিকই। প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি মানুষকে কী দেবেন একজন সচেতন শিল্পীর নিরিখে, একজন প্রকাশকের দূরদর্শীতায় বা একজন সামাজিক মানুষের নৈতিক দায়িত্বে? করণ জোহরের নেকুপুসু হৃদয় খোঁড়া বেদনার আলেখ্যর বঙ্গীকরণ, সব 'গেল গেল' বা আমরা এক 'নেই-রাজ্য'-তে বাস করি, সব কর্পোরেট কেড়ে নিল - এই আক্ষেপ, নাকি চিন্তার খোরাক যা সত্যিই ঋত্বিক ঘটকের মননশীলতার কাছাকাছি আমাদের 'ভাবা প্র্যাকটিস করতে' বাধ্য করাবে?

Comments

Popular posts from this blog

অনাদায়

  ১। যে আঁচেতে পুড়ে যাওয়া একটু একটু করে, সে আগুন তোমার তো নয় জানি। তবে? বসুধা কুটুমবাড়ি, অতএব পুড়ে যেতে হবে। কোথায় জ্বলছে পেট, কোথায় চাকরি, বাড়ি, যেদিকে তাকাই সবাই ছুট্টে আসে, জন্মপঞ্জি নিয়ে। মা বাবার পরিচয় চায়। ওরা বলে, দেখছ না? একই তো পেটের ফল। আর বল্‌, পাপ নিবি কি না? এই পাপ আমাদের একা করে কোন খাদে নিয়ে যাবে, এখনও জানি না।       ২। এমন করলে কেন? বুঝেছিলে মৃত্যু আসীন? এ প্রশ্নে একটি রক্তবাণ বিদ্ধ করে, সমস্ত দিন, সমস্ত রাত নির্ঘুম। দিনে রাতে পেয়াদার ডাক, আড়ং ধোলাই আসে আকাশকুসুমে, থাক থাক, আর মেরো না খোদাতালা, প্রভুর দাসেরে। বল সুবিনীত হবে? হব, তবে তোমার জন্যে এই টক্সিক উপোস-কানুন নেশা জানিনা কিচ্ছুটি, শেষ হবে কবে।     ৩। নিজের দূরাত্মীয়, সেই হল এখন প্রথমা। ভেবেছিলে সেটাই দায়িত্ববোধ। একবার হাত পাতলে সেই হাত ফিরে ফেরে, সেটা জানতে না বুঝি? বলেছিল তোমার আত্মজ। আসল আত্মীয় কে? অন্য কেউ? দুরাত্মা? জারজ?     ৪। এটুকু কিছুই নয়। ঢের বাকি আছে। সামাজিক অপমান , পুলিশ , আদালত , পাড়াছাড়া। র...

পাড়া ক্রিকেট

  নিয়ে আয় খেলোয়াড়ি বল, উড়ুক তুফানে উইকেট‌; আগেভাগে পিচটিচ ঠিক কর তোরা – আমার উদ্যানে। বাড়ির সামনে চেঁচা উত্তাল - "ভাই, ভাই ওটা পায়ে‌ লেগেছিল", ভেঙে ফ্যাল আমাদের নিশ্চুপ পাড়ার বিকেলঘুম, নিজের দিকেতে শাসানির চারটে আঙুল, আর বিরুদ্ধতার তর্জনী। আমাদের শীতকাল, বয়স বিরুদ্ধতা জুড়িয়ে উঠুক, জুড়িয়ে উঠুক সব বন্ধুতা বিচ্ছেদ, চাকরির অপলাপ এইচ-আর সালিশী সভা; আর জুড়িয়ে তুবড়ে দে, দে তো‌ দেখি, হিংসুটে দৈত্যের বাগানেতে অপ্রতিম কাঁটাগাছ, আর ভেতরেতে নুয়ে পড়া করুণ জবা। মধ্যবয়সে যারা বুড়ো ভাম, ভীমরতি প্রাপ্তির সামান্য দূরে – এটুকু মানতে পারি, আমাদের বাপ, মা, কাকারাই পাড়ায় পাড়ায় আদরে, বেনামে, কালো টাকা আর সবুজ উদ্যানে, ফেলেছে সিন্ডিকেট, নির্মিয়মাণ ফ্ল্যাট, ফণীমনসার কাঁটা বেড়ার স্তবক। এখন বিকেল হল। আমার পাড়াকে তোরা টেনে আন উদ্যানে। আমাদের আওয়াজের ভদ্রতা ভয়টুকু ব্যাটেতে, বলেতে নাচা- "আউট, আউট"। শেখা ঢের বাকি আছে নীতি বা সবক। ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

সুসংবাদ, এসো

সুসংবাদ আর আসেনা  আর সত্যিই আসেনা আমার এই দিনানুদিনে। অতএব, আমি তো সত্যিই এই ঝাকানাকা অতীতবিলাসটুকু ভাঙিয়ে খাই‌। আর মেয়ে পটাতে গিয়ে বলি, মাত্র পনেরোতে,  মানে তাও তো পনেরো হল, সুনীল গাঙ্গুলী আমাকে একদিন পিছলে পড়ে স্কচ খাইয়ে, নাকি কৃত্তিবাসে কবিতা ছাপিয়ে দেবে বলেছিল। হেঁ, হেঁ... কেউ কথা রাখেনি। কেউ কি রাখে? তাও তো হাফে... হাফ হাতা, শালা,  হাঁটুর বয়সে... খুশি। খুশি, মেড়ো মাল  নতুন বাংলা লিখা শিখেছে হাঁটুর বয়সে,  এই তো ইদ্রিস ওর হাঁটুর বয়সে, ব্যথা, বিয়ে হবে ওদের।  প্রজাপত্য। আর লেখা ছাপা হবে আনন্দ...আনন্দ, দেশ, আমাদের দেজ... এসো, সীমাহীন সুসংবাদ, এসো সুসংবাদ, এসো! ১৮ এপ্রিল,‌ ২০২৬