Skip to main content

শুদ্ধ সারং ও শৃঙ্গার

ভেঙ্গে পড়তে নেই, শতদ্রু। পৃথিবীতে যতদিন কল্যাণ রাগের স্বর জীবিত আছে, ততদিন ভেঙে পড়তে নেই। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছ? "পৃথিবীর গভীর, গভীরতর অসুখ এখন" । তাই সবাইকে আর বছর কুড়ি পরে, মাসে একবার করে হাসপাতালে থাকতে হবে। অথচ কী আশ্চর্য দেখ, কেন যাও হাসপাতালে? সুস্থ হবে বলে, বেঁচে যাবে বলে। বোন ambulance ডাকে। তোমার প্রতিবন্ধী বাবা বিপন্ন হন; আরও বিষণ্ণ হন। পাড়ায় সন্ধ্যেবেলা আসে oxygen cylinder ভর্তি গাড়ি। শূন্য চোখে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেন তোমার মা, প্রার্থনা করেন। কেন? শুদ্ধ সারং আছে বলে তাই, এখনও তুমি হাসপাতাল থেকে লাফিয়ে বাড়িতে ঢোক - তাই।

পরশু তুমি সকাল ন'টায় হাসপাতালে গেছ। আমি দু'বছর পর, জানো, তাই শুদ্ধ সারং নিয়ে বসলাম। কল্যাণের আশ্চর্য সন্তান এক এই রাগ। এখন জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন, শতদ্রু। তাই পৃথিবীতে আর কোনদিন ভাই-বোনেরা, কাকা-জেঠুরা জন্ম নেবে না। তবে একসময় নিত, যখন জন্মেছিল শুদ্ধ সারং। মায়ের বেখাপ্পা ছেলে, বাবার অবাধ্য ছেলে। কল্যাণের সমস্ত সন্তান যখন তাই স্বভাবে পেলব, আবেগে কমনীয়, তাদের চোখ ভিজে যায় অল্পতে, রোদের আলো সহ্য করতে পারে না কেউ, তখন এই অসংজাত শুদ্ধ সারং সকাল ন'টার পর বেরিয়ে পড়ে নিরঙ্কুশ বিক্রমে, প্রতিস্পর্ধী আত্মশ্লাঘায়।

অফিস যাচ্ছ। এমন সময় চোখে পড়ল তোমার স্ত্রীকে। তিনিও অফিসে বেরোবেন। আয়নার সামনে তোমার স্ত্রী foundation, gloss পর্বের পর সেরে নিচ্ছেন প্রসাধনের শেষটুকু। এমন সময় শুদ্ধ সারং নেমে আসে খাঁ সাহেবের গ্লানিহীন আওয়াজে - "সলোনে নয়ননবা মে, ডারত গোরী কাজরবা।" পেলব রোদ এসে পড়েছে ওঁর চিবুকে। সুন্দর মনে হচ্ছে ওঁকে। এত সুন্দর আগে কোনদিন লাগেনি কেন? হালকা জড়িয়ে ধরো, মাথা ডুবিয়ে নাও ওঁর চুলের গন্ধে, নিঃশ্বাসে, বিশ্বাসে।

শুদ্ধ সারং এক পুরুষের দৃষ্টিতে তার জীবনের সমস্ত নারী। প্রত্যেকবার নতুন, প্রত্যেকবার অভূতপূর্ব। মধ্য সপ্তকের শুদ্ধ মধ্যম, রে আর মন্দ্র সপ্তকের নি-এর মীড় আর পঞ্চমে সম্পূর্ন সমর্পণ - কে জানাবে এভাবে বল তো? আমার এক সমপ্রেমী পুরুষ বন্ধু তাই গত মাসেই এক সকালে আমাকে জানায় - শুদ্ধ সারং-ই মৈথুন। শুদ্ধ সারং-ই আদর, হাত, বুকের লোমের এলোমেলো গন্ধ পেরিয়ে সকালে অফিসের উপেক্ষিত ডাক। শুদ্ধ সারং স্মৃতি, সাজগোজ, মধ্য থেকে তার সপ্তকের একমাত্র রাগ, যে বুকেতে সরোদ বাজিয়ে তোলে। 'পুরুষ কীভাবে কাঁদে', তা শুধু সরোদ জানেনা, শুদ্ধ সারং-ও জানে।

পাড়ায় পাড়ায় যুদ্ধবাজ কিছু লোক চা খেতে বেরিয়ে এসেছে, শতদ্রু। এখনই ওরা নিজেদের মধ্যে দাঙ্গা লাগাবে, বিভক্ত হয়ে যাবে দলে দলে, ছুড়ে দেবে বিষ-বাক্যের বোমা। কারণ (cause) খুঁজবে ওরা। শনাক্ত করবে, তারপর নিজেরাই তুলে আনবে সাব্যস্ত দোষীকে (accused)। আর সময় হলে, সমস্ত বিরোধী স্বর মিলিয়ে যাবে বাপুজী কেক, লম্বু আর চায়ের আলাপেই। তখন ওরা মেনে নেবে, পৃথিবীতে কেউ দোষী নয়, সবাই excused। চায়ের দোকানটুকু দাঙ্গার পরেও বেঁচে যাবে আর ওরা বাড়ি ফেরার পথে আমার জানলা পেরোতে পেরোতে শুনতে পাবে শুদ্ধ সারংয়ের শেষ বিস্তার।

তুমি খুব তাড়াতাড়ি বাড়ি ফের। আমরা একসাথে দ্রুত খেয়ালটা এবার রেওয়াজ করব, কেমন?

২ মার্চ, ২০২২

Comments

Popular posts from this blog

অনাদায়

  ১। যে আঁচেতে পুড়ে যাওয়া একটু একটু করে, সে আগুন তোমার তো নয় জানি। তবে? বসুধা কুটুমবাড়ি, অতএব পুড়ে যেতে হবে। কোথায় জ্বলছে পেট, কোথায় চাকরি, বাড়ি, যেদিকে তাকাই সবাই ছুট্টে আসে, জন্মপঞ্জি নিয়ে। মা বাবার পরিচয় চায়। ওরা বলে, দেখছ না? একই তো পেটের ফল। আর বল্‌, পাপ নিবি কি না? এই পাপ আমাদের একা করে কোন খাদে নিয়ে যাবে, এখনও জানি না।       ২। এমন করলে কেন? বুঝেছিলে মৃত্যু আসীন? এ প্রশ্নে একটি রক্তবাণ বিদ্ধ করে, সমস্ত দিন, সমস্ত রাত নির্ঘুম। দিনে রাতে পেয়াদার ডাক, আড়ং ধোলাই আসে আকাশকুসুমে, থাক থাক, আর মেরো না খোদাতালা, প্রভুর দাসেরে। বল সুবিনীত হবে? হব, তবে তোমার জন্যে এই টক্সিক উপোস-কানুন নেশা জানিনা কিচ্ছুটি, শেষ হবে কবে।     ৩। নিজের দূরাত্মীয়, সেই হল এখন প্রথমা। ভেবেছিলে সেটাই দায়িত্ববোধ। একবার হাত পাতলে সেই হাত ফিরে ফেরে, সেটা জানতে না বুঝি? বলেছিল তোমার আত্মজ। আসল আত্মীয় কে? অন্য কেউ? দুরাত্মা? জারজ?     ৪। এটুকু কিছুই নয়। ঢের বাকি আছে। সামাজিক অপমান , পুলিশ , আদালত , পাড়াছাড়া। র...

পাড়া ক্রিকেট

  নিয়ে আয় খেলোয়াড়ি বল, উড়ুক তুফানে উইকেট‌; আগেভাগে পিচটিচ ঠিক কর তোরা – আমার উদ্যানে। বাড়ির সামনে চেঁচা উত্তাল - "ভাই, ভাই ওটা পায়ে‌ লেগেছিল", ভেঙে ফ্যাল আমাদের নিশ্চুপ পাড়ার বিকেলঘুম, নিজের দিকেতে শাসানির চারটে আঙুল, আর বিরুদ্ধতার তর্জনী। আমাদের শীতকাল, বয়স বিরুদ্ধতা জুড়িয়ে উঠুক, জুড়িয়ে উঠুক সব বন্ধুতা বিচ্ছেদ, চাকরির অপলাপ এইচ-আর সালিশী সভা; আর জুড়িয়ে তুবড়ে দে, দে তো‌ দেখি, হিংসুটে দৈত্যের বাগানেতে অপ্রতিম কাঁটাগাছ, আর ভেতরেতে নুয়ে পড়া করুণ জবা। মধ্যবয়সে যারা বুড়ো ভাম, ভীমরতি প্রাপ্তির সামান্য দূরে – এটুকু মানতে পারি, আমাদের বাপ, মা, কাকারাই পাড়ায় পাড়ায় আদরে, বেনামে, কালো টাকা আর সবুজ উদ্যানে, ফেলেছে সিন্ডিকেট, নির্মিয়মাণ ফ্ল্যাট, ফণীমনসার কাঁটা বেড়ার স্তবক। এখন বিকেল হল। আমার পাড়াকে তোরা টেনে আন উদ্যানে। আমাদের আওয়াজের ভদ্রতা ভয়টুকু ব্যাটেতে, বলেতে নাচা- "আউট, আউট"। শেখা ঢের বাকি আছে নীতি বা সবক। ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

সুসংবাদ, এসো

সুসংবাদ আর আসেনা  আর সত্যিই আসেনা আমার এই দিনানুদিনে। অতএব, আমি তো সত্যিই এই ঝাকানাকা অতীতবিলাসটুকু ভাঙিয়ে খাই‌। আর মেয়ে পটাতে গিয়ে বলি, মাত্র পনেরোতে,  মানে তাও তো পনেরো হল, সুনীল গাঙ্গুলী আমাকে একদিন পিছলে পড়ে স্কচ খাইয়ে, নাকি কৃত্তিবাসে কবিতা ছাপিয়ে দেবে বলেছিল। হেঁ, হেঁ... কেউ কথা রাখেনি। কেউ কি রাখে? তাও তো হাফে... হাফ হাতা, শালা,  হাঁটুর বয়সে... খুশি। খুশি, মেড়ো মাল  নতুন বাংলা লিখা শিখেছে হাঁটুর বয়সে,  এই তো ইদ্রিস ওর হাঁটুর বয়সে, ব্যথা, বিয়ে হবে ওদের।  প্রজাপত্য। আর লেখা ছাপা হবে আনন্দ...আনন্দ, দেশ, আমাদের দেজ... এসো, সীমাহীন সুসংবাদ, এসো সুসংবাদ, এসো! ১৮ এপ্রিল,‌ ২০২৬