Skip to main content

আকাশকুসুম

 সমস্ত বিকেল যখন আলো করে বেজে উঠছে ট্রেনের হর্ণ, পৃথিবীজোড়া সমস্ত প্ল্যাটফর্মে হামলে পড়ছেন নিত্যযাত্রীরা, পাড়ার মন্দিরে জটলা হচ্ছেন ধার্মিকেরা খিচুড়ী প্রসাদের খোঁজে, তখনই যেতে হবে পবনদার দোকানে। কতরকমের বিকেলই তো আসে আর নষ্ট হয়। সময় নষ্ট করে কাটান আড্ডাবাজেরা। অনর্থক খালি পেটে স্তরের মত জমতে থাকে চায়ের নিভৃত আদর। চা ছাড়া চলবে কী করে? কী নিজস্ব এই নেশা, কতরকমের তার আদল। লিকার চা, দুধ চা, চিনি দিয়ে লিকার, চিনি ছাড়া দুধ চা। আরেকটু এগিয়ে গিয়ে গ্রীন টি, মকাইবাড়ী ; সাম্প্রতিক সংযোজন মধু দিয়ে চা, লেবু চা ইত্যাদি ইত্যাদি। এক একটা কাপ শেষ হতে থাকে ; ওহ্‌, না না। ভাঁড়। মাটির ভাঁড়ের সাথে চায়ের নিজস্ব আত্মীয়তা রয়েছে। একই চা তাই কাগজের কাপ আর মাটির ভাঁড়ে একরকম লাগে না।

এমন চা পাগলদের কাছে রয়েছে অনেক আস্তানা। তবে পবনদার দোকান মানে তো শুধু চা নয় ; একটা আস্ত জীবনযাত্রার দিনলিপি। একা মানুষের কতরকম সকাল আসে প্রতিদিন। একএকদিন কেজো সকালগুলোতে যখন অলস ডানা তুমি খুলে তাকাচ্ছ ইতস্তত জানলার বাইরে, ভাবছ ‘কাজে যাওয়ার সত্যি দরকার আছে কি?’, ঠিক সেইসময়েই তোমার মনে পড়ে যাচ্ছে দু’পা এগোলেই স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে সেই ভোর পাঁচটায় নেমেছেন পবনদা। ক্যানিং থেকে আসেন প্রত্যেকদিন ; আবার কাজ গুটিয়ে বেড়িয়ে পড়েন রাত ১০টা পেরোলেই। গৃহহীনের ঘর যেন ওঁর এই দোকান। আমি তো জানি, ঘর তো শুধু চারটে দেওয়ালের মধ্যে নেই ; তার সাথে জুড়ে যান পরিচিত মানুষজন, তাদের মধ্যে বেড়ে ওঠা লক্ষ্যহীন কথোপকথন, ধাপে ধাপে বেড়ে ওঠা নিবিড় আত্মিক বন্ধন – সমস্তটা মিলেই ঘর। পবনদা তাই স্ত্রীয়ের সাথে মানিয়ে নিতে পারেন নি। তাই খুঁজে যাচ্ছেন তৃতীয় একটা ঘর ; অর্বাচীন সুর গুলোর মধ্যে গান খুঁজে যাচ্ছেন প্রতিদিন ।পবনদার দোকান ঘিরে জটলা হওয়া মানুষজনও তো তাই।
সমস্ত হারিয়ে পেশাজীবন শেষ করে এঁরা বিকেল বিকেল চলে এসেছেন জিজ্ঞেস করতে, আরও কোনো সবহারা আছেন কি? আমার মত?
পেয়ে যান, পেয়েই যান অনেকে। প্রত্যেকদিন বিকেলগুলো ডিমের কুসুমের মত ছলকে পড়ে আকাশজুড়ে ; সমস্ত মানুষের ব্যস্ত আওয়াজে বেড়ে ওঠে একটা আরও বেঁধে বেঁধে থাকার আকূতি আর সেই সময়ই আমার মত কেউ ভিড় ঠেলে, মাথা গলিয়ে পবনদাকে বলে ওঠে “একটা বাটার টোস্ট আর ডবল ডিমের পোচ”। ডিমগুলো এক বিকেল আকাশের মত গা এলিয়ে দিচ্ছে ফ্রাইং প্যানে, আর আমি শুনতে পাচ্ছি সে’সব গান একের পর এক , যা কোনোদিন শুনিনি চায়ের দোকানে – “অতল কালো স্নেহের মাঝে, ডুবিয়ে আমায় স্নিগ্ধ করো”। এরকম প্লে লিস্ট শোনো, পবন দা? উত্তর দেয় না। পরম মমতায়, পোচের ওপর নুন, গোলমরিচ ছিটিয়ে এক কোণ দিয়ে ছিপছিপে হাতে প্লেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “নাও, ধরো”...
এক মুঠো আকাশ এখন তলতল করছে আমার কাছে...

2017

Comments

Popular posts from this blog

অনাদায়

  ১। যে আঁচেতে পুড়ে যাওয়া একটু একটু করে, সে আগুন তোমার তো নয় জানি। তবে? বসুধা কুটুমবাড়ি, অতএব পুড়ে যেতে হবে। কোথায় জ্বলছে পেট, কোথায় চাকরি, বাড়ি, যেদিকে তাকাই সবাই ছুট্টে আসে, জন্মপঞ্জি নিয়ে। মা বাবার পরিচয় চায়। ওরা বলে, দেখছ না? একই তো পেটের ফল। আর বল্‌, পাপ নিবি কি না? এই পাপ আমাদের একা করে কোন খাদে নিয়ে যাবে, এখনও জানি না।       ২। এমন করলে কেন? বুঝেছিলে মৃত্যু আসীন? এ প্রশ্নে একটি রক্তবাণ বিদ্ধ করে, সমস্ত দিন, সমস্ত রাত নির্ঘুম। দিনে রাতে পেয়াদার ডাক, আড়ং ধোলাই আসে আকাশকুসুমে, থাক থাক, আর মেরো না খোদাতালা, প্রভুর দাসেরে। বল সুবিনীত হবে? হব, তবে তোমার জন্যে এই টক্সিক উপোস-কানুন নেশা জানিনা কিচ্ছুটি, শেষ হবে কবে।     ৩। নিজের দূরাত্মীয়, সেই হল এখন প্রথমা। ভেবেছিলে সেটাই দায়িত্ববোধ। একবার হাত পাতলে সেই হাত ফিরে ফেরে, সেটা জানতে না বুঝি? বলেছিল তোমার আত্মজ। আসল আত্মীয় কে? অন্য কেউ? দুরাত্মা? জারজ?     ৪। এটুকু কিছুই নয়। ঢের বাকি আছে। সামাজিক অপমান , পুলিশ , আদালত , পাড়াছাড়া। র...

পাড়া ক্রিকেট

  নিয়ে আয় খেলোয়াড়ি বল, উড়ুক তুফানে উইকেট‌; আগেভাগে পিচটিচ ঠিক কর তোরা – আমার উদ্যানে। বাড়ির সামনে চেঁচা উত্তাল - "ভাই, ভাই ওটা পায়ে‌ লেগেছিল", ভেঙে ফ্যাল আমাদের নিশ্চুপ পাড়ার বিকেলঘুম, নিজের দিকেতে শাসানির চারটে আঙুল, আর বিরুদ্ধতার তর্জনী। আমাদের শীতকাল, বয়স বিরুদ্ধতা জুড়িয়ে উঠুক, জুড়িয়ে উঠুক সব বন্ধুতা বিচ্ছেদ, চাকরির অপলাপ এইচ-আর সালিশী সভা; আর জুড়িয়ে তুবড়ে দে, দে তো‌ দেখি, হিংসুটে দৈত্যের বাগানেতে অপ্রতিম কাঁটাগাছ, আর ভেতরেতে নুয়ে পড়া করুণ জবা। মধ্যবয়সে যারা বুড়ো ভাম, ভীমরতি প্রাপ্তির সামান্য দূরে – এটুকু মানতে পারি, আমাদের বাপ, মা, কাকারাই পাড়ায় পাড়ায় আদরে, বেনামে, কালো টাকা আর সবুজ উদ্যানে, ফেলেছে সিন্ডিকেট, নির্মিয়মাণ ফ্ল্যাট, ফণীমনসার কাঁটা বেড়ার স্তবক। এখন বিকেল হল। আমার পাড়াকে তোরা টেনে আন উদ্যানে। আমাদের আওয়াজের ভদ্রতা ভয়টুকু ব্যাটেতে, বলেতে নাচা- "আউট, আউট"। শেখা ঢের বাকি আছে নীতি বা সবক। ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

সুসংবাদ, এসো

সুসংবাদ আর আসেনা  আর সত্যিই আসেনা আমার এই দিনানুদিনে। অতএব, আমি তো সত্যিই এই ঝাকানাকা অতীতবিলাসটুকু ভাঙিয়ে খাই‌। আর মেয়ে পটাতে গিয়ে বলি, মাত্র পনেরোতে,  মানে তাও তো পনেরো হল, সুনীল গাঙ্গুলী আমাকে একদিন পিছলে পড়ে স্কচ খাইয়ে, নাকি কৃত্তিবাসে কবিতা ছাপিয়ে দেবে বলেছিল। হেঁ, হেঁ... কেউ কথা রাখেনি। কেউ কি রাখে? তাও তো হাফে... হাফ হাতা, শালা,  হাঁটুর বয়সে... খুশি। খুশি, মেড়ো মাল  নতুন বাংলা লিখা শিখেছে হাঁটুর বয়সে,  এই তো ইদ্রিস ওর হাঁটুর বয়সে, ব্যথা, বিয়ে হবে ওদের।  প্রজাপত্য। আর লেখা ছাপা হবে আনন্দ...আনন্দ, দেশ, আমাদের দেজ... এসো, সীমাহীন সুসংবাদ, এসো সুসংবাদ, এসো! ১৮ এপ্রিল,‌ ২০২৬