কিছুদিন আগেই ফেসবুকে একজন বলছিলেন যে, নাটকের টিকিটের দাম বাড়ানো উচিত। আমার ঘোরতর আপত্তি ছিল এই নিয়ে যে, বাংলা নাটকের অধিকাংশের মান দিন দিন এতই তলানিতে ঠেকছে (তার পারিপার্শ্বিক কিছু সঙ্গত কারণও রয়েছে; সবটাই নাট্যদলের দোষ দেওয়া যায় না) যে, বেশিরভাগ নাটক ১০০ টাকা দিয়ে দেখার পরেও মনে হয় - টাকাটা জলে গেল। সম্প্রতি স্বপ্নসন্ধানীর "হ্যামলেট" দেখেছি। যে দল "একলা চল রে"-র মত দুর্দান্ত একটি প্রযোজনা করতে পারে, তারাই শেক্সপিয়ারকে কোন মধ্যমেধায় নামিয়ে আনতে পারে সেটা দেখেছি। একটা নাটক শুধুমাত্র অভিনয় দিয়ে টানা যায় না। বহুমাত্রিক শিল্প বলে তাকে স্ক্রিপ্ট, মঞ্চ, আলো, আবহ, চরিত্রদের শরীরী ভাষা- এই সমস্তটা নিয়েই একটা ভালো নাটক হয়ে উঠতে হয়। যেমন শোহনের হেলমেট, যেমন সায়কের দায়বদ্ধ বা দৌড়নামা, যেমন স্বপ্নসন্ধানীর দর্জিপাড়ার মর্জিনারা বা একলা চলো রে, তৃতীয় সূত্রের বিসর্জন, অঞ্জন দত্তের গ্যালিলিও, সংসৃতির বিকেলে ভোরের সর্ষেফুল অথবা সম্প্রতি প্রাচ্যের বালজাকের প্রেমিকারা ।
বাংলা গানের এক গুরুস্থানীয় মানুষ আমাকে একবার বলেছিলেন যে, বাংলা গানের অ্যালবাম উঠে যাওয়ার অনেক বিপণনগত সমস্যার বাইরেও অন্যতম কারণ যে, একটা অ্যালবামে আটটা গানের মধ্যে বড়জোর দুটো কি তিনটে ভালো গান খুঁজে পাওয়া যায়। Consistency - এটা শিল্পীদের বরাবরই বড় সমস্যা। এটা শুধু বাংলা বা গানের বিষয়েই প্রযোজ্য তা নয়, এ অভিযোগ সমস্ত শিল্পের ক্ষেত্রেই আর সারা পৃথিবী জুড়েই।
এ লেখায় গৌরচন্দ্রিকাই বড্ড বেশি হয়ে গেল। এত কথা লিখলাম যা বলতে সেটা হল, আজ Natadha-র মহাভারত ২ দেখতে গিয়েছিলাম। আমার মতে বাংলা নাটক দলগুলির মধ্যে এটি এখন পর্যন্ত আমার দেখা একমাত্র দল, যারা একনাগাড়ে ভালো কাজ করে যাচ্ছেন - কোনটা একটু বেশি ভালো, কোনটা একটু কম - কিন্তু প্রত্যেকটাই বেশ ভালো। ওপরে যে বিষয়গুলো নিয়ে লিখছিলাম, যেসবের জন্য একটা নাটকের কাছে ফিরে যেতে চাই অফিস bunk করে, planned sick leave নিয়ে, অথবা গানের, ফরাসির অথবা ফাইনান্সিয়াল ট্রেনিং-এর ছাত্রদের ওপর অবিচার করেই তাদের সেশনগুলো স্কিপ করে - সেসব অবশ্যম্ভাবী কারণেরা সবাই উপস্থিত নটধার সমস্ত প্রযোজনায়। এ নাটকও তার ব্যতিক্রম নয়। মহাভারত ২ - শুধু যে আজকের সময়ের ক্রাইসিসের কথা বলে তা নয় বরং প্রত্যেকটা মানুষের উত্তরাধিকারে পাওয়া ক্ষোভ, একাকীত্ব, যন্ত্রণা এবং না-মানুষ হয়ে ওঠার পেছনে যে পরিব্যাপ্ত, অনন্ত বিষাদ থেকে যায় তার একটা দিনলিপির মত কাজ করে। এইসব নাটকের কাছে দিনের শেষে শুশ্রূষার মত ফিরে আসতে হয়, যেখানে দুর্যোধন ভাবেন দ্রৌপদীর কাছে ক্ষমা চাইবেন কিনা তারপরে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, "না থাক", ধৃতরাষ্ট্র গলায় ও শরীরে ভেঙে ভেঙে পড়েন তার অন্ধত্বের ক্লীব-পরাক্রমের কাছে, সহদেব দুর্নিবার বিদ্রোহী হয়ে উঠতে চান - প্রত্যেকটি চরিত্র হয়ে ওঠে আমাদের পরিচিত চরিত্র কিংবা আমাদেরই এক এক মুহূর্তে খুব vulnerable এক একটা আমি।
আসলে শুধু কবিতার নয়, অরুণকুমার সরকার যেমন লিখেছিলেন, তেমন যে কোন ভাল শিল্পেরই প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্মরণীয় হয়ে থাকা। আজ সন্ধ্যেয় কী নিয়ে বাড়ি ফিরছি? গত ১৩ বছরে বারবার একাডেমী, রবীন্দ্রসদন, মিনার্ভা মধুসূদন যাওয়ার কারণগুলোর একটা পরিণতি নিয়ে। অভিনয় করতে পারিনি কোনদিন কিন্তু অভিনয় ভালোবাসি, থিয়েটারকে ভালোবাসি। এক একটা নাটক যখন সেই ভালোবাসার কথা বলে, অনুভবের কথা বলে, সেটাকে যেমন ভাবে দেখতে চাই বা বলতে চাই - ঠিক সে ভাবে বলে দেয়, তখন এক্সাইড মোড়ে হঠাৎ করে হর্ণের আওয়াজ বুজে আসে, ট্রাফিকের আর গাড়ির হেডলাইট উজ্জ্বলতর হয়, মেট্রো ফেরত দেখা হয়ে যায় নতুন কোন মনভোলানো কোনো স্বপ্নিল তরুণীর সাথে
Comments
Post a Comment