সে চলে গেলে, তার চলে যাওয়াটা টের পাওয়া যায় পুজোর পর দ্বাদশীর এই বিকেলের মত। বিসর্জনের পর প্রতিমার বেদীর ওপর একলা পোড়ে সলতের কালো। একাদশী সন্ধ্যার শেষে শহরের ভিড়কেও একটু ক্লান্ত মনে হয়। রাস্তাঘাট একটু একটু করে ফাঁকা হতে থাকে। পাড়ায় পাড়ায় প্যাণ্ডেলের জামাকাপড় সবার চোখের সামনে হিড়হিড় করে খুলে নেয় কেউ। এসব দেখে আমাদের কারো কারো মনে হয়, এইসব আলোর উৎসব একটা মুহূর্তের মলম, গভীর গভীরতর ক্ষতকে চারটে দিন ভুলে থাকার একটা sleeping pill. বাঁশের গায়ের কালশিটের মত হঠাৎ একটু একটু করে চিড়বিড়িয়ে ওঠে আমাদের অসুখী দাম্পত্য, সামাজিক নাটুকে মেলামেশা কিংবা right bundle branch block করা অফিসের ক্রমাগত একবগ্গা অপমান আর মিথ্যে প্রমোশনের প্রতিশ্রুতি - সবই আছে, আছে, আছে।
একডালিয়ার বাড়িতে এ'কদিন বেশ কাটাচ্ছিলেন ষাটোর্ধ্ব অজয় জেঠু। পাড়ার ভীড়ে, চল্লিশের কোঠায় পৌঁছনো ভারতের তিন প্রান্তে কাজের সূত্রে থাকা তিন বন্ধুর সপরিবার হুল্লোড় কিংবা সদ্য কলেজ ক্যাম্পাসিংয়ে চাকরি পাওয়া দু'জনকে আইস্ক্রিম নিয়ে চুমু খেতে দেখে নিজের পঁচিশ তিরিশের কাছে ফিরে গিয়েছিলেন শেষ কিছুদিন। প্রতি বছরই এই সময় আর ইনসুলিন নিতে হয় না। প্রেসারও প্রায় স্বাভাবিক থাকে; অন্ততঃ তেমনটাই তো মনে হয়। কাল বিকেল অবধি সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল। আজ আবার রান্না করতে গিয়ে একটু হাঁপিয়ে পড়ছেন। সোফা ঝাড়ার সময় তো মাথাটা খানিক টাল খেয়ে গেল। আবার সব ফিরে ফিরে আসছে - হলুদ ঘোলাটে বিকেল, প্রণবের শ্মশানযাত্রার স্মৃতি, মাঝরাতে নেভি কাটের ছাইয়ে চাদরে গর্ত হয়ে যাওয়া, ইনসমনিয়া... সব।
কীভাবে আগামী লক্ষ্মী পুজো থেকে জগদ্ধাত্রী পুজো মানে আসলে পুজোর চারদিনের হঠাৎ চলে যাওয়ার শূন্যতার সাথে বোঝাপড়ার একটা আশ্রয় এবং এই সবকিছুই আমাদের সমস্ত ঘেঁটে যাওয়া অসুস্থতা নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য একটা অবশ্যম্ভাবী বুস্টার ডোজ - এটা বুঝতে অজয় জেঠুর বয়স অবধি পৌঁছনোর প্রয়োজন নেই। দ্বাদশীতে নিউ আলিপুর গেলে, আহিরীটোলার পুজো থেকে খানিক দূরে ও-পাড়ার বিকেলের আলো দূর থেকে দেখলে কিংবা একবার চাঁদপাল বা আউট্রাম ঘাটে গিয়ে দাঁড়ালে এই অস্বস্তিকর উত্তরগুলো আপনিই টের পাওয়া যায়। কিন্তু পুরো ব্যাপারটা একটা ধূপের ধোঁয়ার মত আস্তে আস্তে গাঢ় থেকে পাতলা হয়ে ছড়িয়ে যাওয়ার মত। আমাদের ভেতরে পৌঁছতে খানিক সময় লাগে। আর যখন শেষ অবধি এর উপস্থিতির কথা একটু একটু জানি, ততক্ষণে আলো নিভে এসেছে। নিকোটিনে ফুসফুস এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেছে। গলগল করে বেরিয়ে আসছে ফাঁপা ধোঁয়া, শুধু কালো আর কালো

Comments
Post a Comment