Skip to main content

সুশাসন ও স্বশাসন

 কিছু কিছু শাসন মানুষকে সুন্দর করে। আমাদের নিয়ে আসে নিজের কাছাকাছি। কেউ শাসন করলে রাগ হয়। মনে‌ হয়, আমার‌ স্বাধীনতার ওপর নিদারুণ স্বেচ্ছাচারিতা। রাগ পড়লে‌, থিতু হয়ে নিজের কাছাকাছি বসি। তখন মন-মাথা এক লাইনে দাঁড়িয়ে । এবার মনে হয়, এমনই তো হতে চেয়েছিলাম। হতে পারি না। ভাবি, মোবাইলকে একটা ফোন বাদে অন্য ভাবে কিংবা উবর্ ডাকা ছাড়া ব্যবহার করব না আর। সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটানো কমিয়ে দেব। অ্যাপ নামানো হয় - স্ক্রিনটাইম ব্লকার। এক দুটো অন্ধকার সরাতে গিয়ে, আরও বেশি অন্ধকারে জড়িয়ে পড়ি, ভাস্কর চক্রবর্তী যেমন লিখেছিলেন।‌

"ওই জিমেলটা ক'দিনের মধ্যে ডিলিট হবে? তুমি পারো‌‌না , আমি জানি। আর কেউ‌ পারেনা? ফোনের‌ দোকান পারে‌না?" - ট্রেনে আজ ছেলেটি বলছিল। কেন‌ বলছে সে? ভালোবাসে তাই। আগলে রাখবে তাই। যেমন করে তুমি চাকরি আগলে রাখ বা নিজের মায়ের জীবৎকালকে। প্রিয় কিছুকে আমরা সম্পূর্ণ অধিকার থেকে শেষ‌ পর্যন্ত চাই। নারীবাদী বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীরা হৈ হৈ করে তেড়ে আসবে - এ কীরকম কথা? তুমি বলে দেবে আমি কী করব?
হ্যাঁ। মাঝে মাঝে বলে দিতে হয় বৈকি! রিহানা দেউলিয়া হওয়ার পর নিজের financial advisor কে যা বলেছিলেন তার মানেটা কিছুটা এরকমই হয় যে, তুমি থাকতে আমায় কেন‌ শাসন করনি? Advisor-র উত্তর ছিল এই যে, টাকা ওড়াতে নেই এটাও একটা grown-up কাউকে বলে দিতে হয়? উত্তরটা জানা। হ্যাঁ, বলতে হয়।‌ Behavioural finance-র লোকেরা এই স্বশাসনের বাইরের জায়গা‌গুলোও ধরতে চেষ্টা করছেন। রিহানা পরবর্তীতে নিজেকে শাসন করতে শিখেছেন।‌ তাঁর দেউলিয়া হয়ে আবার billionaire হয়ে ওঠার গল্পটিও চমকপ্রদ।
HabitStrong-র প্রতিষ্ঠাতা Rajan Singh কয়েকদিন আগে এই মোক্ষম জায়গাটা ধরেছেন। আমরা আমাদের ইচ্ছেমত অনেককিছু করতে পারি বলেই, আমাদের সারাজীবনে নিজের ইচ্ছেমত কিছু করা হয়ে ওঠেনা। শাসন আমাদের সংযত শুধু নয়, অনেকটাই সংহত করে।
ট্রেনে আমার সামনের সিটে বসা‌ ছেলেটির রাগ একটু কমে এলে বলে, "কথা শুনে চল, কথা শুনে চল। মানুষ ভাল বলবে, ওই জন্যেই বলা।" আর ওকে নিদারুণ লাগে? নিজের বাবার কথা মনে পড়েনা? মায়ের স্বর শুনতে পাচ্ছে কি ওপারে মেয়েটি?
এখন স্কুলে ছাত্ররা শুধুই ক্লায়েন্ট। কোন শাসনের প্রয়োজন নেই - এসব কথা রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শনকে দুমড়ে-মুচড়ে বা খণ্ডিত করে learner-centred শিক্ষাপদ্ধতির নামে আমাদের অনেক শিক্ষাবিদরাই আমাদের গুলিয়ে খাওয়াচ্ছেন। অনুশাসন? তারও কি নূন্যতম প্রয়োজন আছে? মনে পড়ছে কি এমন কারও কথা যিনি স্কুলে শাসনে ছিলেন নির্মম কিন্তু পড়ানোয় স্বচ্ছ? তার ক্লাসগুলো মনে পড়ে আজ?
আমাদের মাথা এই শাসনকে বেশ‌ বোঝে, বেশ নিজের বলে চেনে। নিজের প্রিয় মানুষকে নিখুঁত একটা পড়া দিতে হবে বলে প্রাথমিকভাবে গুটিয়ে যায়, যদি তার মন‌ রাখতে না পারে - এই ভেবে, কিন্তু একটা ঠিক কিছু ঠিকঠাক হলে সে ঠিক ফিরে আসে। এখন আবার কী বলছে ছেলেটি? গলাটা অন্যরকম শোনাচ্ছে? "কী হল? চোখে জলটা আসছে কেন?" ---
আর শুনতে নেই। কিছুটা ওদের ব্যক্তিগত থাক। কিছুটা আমি নিই কুড়িয়ে-টুড়িয়ে। বাঘাযতীন এসে পড়েছে। এবার নামতে হবে।
২৭ জানুয়ারী, ২০২৩

Comments

Popular posts from this blog

অনাদায়

  ১। যে আঁচেতে পুড়ে যাওয়া একটু একটু করে, সে আগুন তোমার তো নয় জানি। তবে? বসুধা কুটুমবাড়ি, অতএব পুড়ে যেতে হবে। কোথায় জ্বলছে পেট, কোথায় চাকরি, বাড়ি, যেদিকে তাকাই সবাই ছুট্টে আসে, জন্মপঞ্জি নিয়ে। মা বাবার পরিচয় চায়। ওরা বলে, দেখছ না? একই তো পেটের ফল। আর বল্‌, পাপ নিবি কি না? এই পাপ আমাদের একা করে কোন খাদে নিয়ে যাবে, এখনও জানি না।       ২। এমন করলে কেন? বুঝেছিলে মৃত্যু আসীন? এ প্রশ্নে একটি রক্তবাণ বিদ্ধ করে, সমস্ত দিন, সমস্ত রাত নির্ঘুম। দিনে রাতে পেয়াদার ডাক, আড়ং ধোলাই আসে আকাশকুসুমে, থাক থাক, আর মেরো না খোদাতালা, প্রভুর দাসেরে। বল সুবিনীত হবে? হব, তবে তোমার জন্যে এই টক্সিক উপোস-কানুন নেশা জানিনা কিচ্ছুটি, শেষ হবে কবে।     ৩। নিজের দূরাত্মীয়, সেই হল এখন প্রথমা। ভেবেছিলে সেটাই দায়িত্ববোধ। একবার হাত পাতলে সেই হাত ফিরে ফেরে, সেটা জানতে না বুঝি? বলেছিল তোমার আত্মজ। আসল আত্মীয় কে? অন্য কেউ? দুরাত্মা? জারজ?     ৪। এটুকু কিছুই নয়। ঢের বাকি আছে। সামাজিক অপমান , পুলিশ , আদালত , পাড়াছাড়া। র...

পাড়া ক্রিকেট

  নিয়ে আয় খেলোয়াড়ি বল, উড়ুক তুফানে উইকেট‌; আগেভাগে পিচটিচ ঠিক কর তোরা – আমার উদ্যানে। বাড়ির সামনে চেঁচা উত্তাল - "ভাই, ভাই ওটা পায়ে‌ লেগেছিল", ভেঙে ফ্যাল আমাদের নিশ্চুপ পাড়ার বিকেলঘুম, নিজের দিকেতে শাসানির চারটে আঙুল, আর বিরুদ্ধতার তর্জনী। আমাদের শীতকাল, বয়স বিরুদ্ধতা জুড়িয়ে উঠুক, জুড়িয়ে উঠুক সব বন্ধুতা বিচ্ছেদ, চাকরির অপলাপ এইচ-আর সালিশী সভা; আর জুড়িয়ে তুবড়ে দে, দে তো‌ দেখি, হিংসুটে দৈত্যের বাগানেতে অপ্রতিম কাঁটাগাছ, আর ভেতরেতে নুয়ে পড়া করুণ জবা। মধ্যবয়সে যারা বুড়ো ভাম, ভীমরতি প্রাপ্তির সামান্য দূরে – এটুকু মানতে পারি, আমাদের বাপ, মা, কাকারাই পাড়ায় পাড়ায় আদরে, বেনামে, কালো টাকা আর সবুজ উদ্যানে, ফেলেছে সিন্ডিকেট, নির্মিয়মাণ ফ্ল্যাট, ফণীমনসার কাঁটা বেড়ার স্তবক। এখন বিকেল হল। আমার পাড়াকে তোরা টেনে আন উদ্যানে। আমাদের আওয়াজের ভদ্রতা ভয়টুকু ব্যাটেতে, বলেতে নাচা- "আউট, আউট"। শেখা ঢের বাকি আছে নীতি বা সবক। ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

বাগানবিলাস

  তোমার সমস্ত উত্তরের সামনে নিশ্চুপ হয়ে বসি। এই দেখেছ বাগানে নিম তুলসি এই দেখো না মৌটুসী মেনে নেয় কেমন ফুলকপির ডাঁটে গড়ে ওঠে নিস্তব্ধ জবা। তোমার খোলা বুকের ফোঁটার দিকে তাকিয়ে থাকি আর মনে হয় এবছর শেয়ারবাজারে সারের ফলন হবে ভালো।