Skip to main content

কলেজ স্কোয়ারে

 এরকম হেমন্তের সন্ধ্যেবেলা আকাশপ্রদীপ জ্বলে ওঠে নাকি? ওঠে তো। নকুড়ের চকোলেট সিঙ্গাড়ায় কামড় দিতে দিতে যখন মান্না দে'র গলায় শুনতে পাই, "কুয়াশার অগোচরে, কে গো তুমি গেলে সরে?" - তখনই তো, তখনই তো! "এখানে জানিস তো, মান্না দে থাকতেন", সুশান্ত দা আজ বলছিল জলভরা সন্দেশ হাতে। এখনও মান্না দে গেয়ে যাচ্ছেন এ পাড়ায়, শেষ জীবনের 'স্বজনের কটু গঞ্জনা' উপেক্ষা করে।

এসব সন্ধ্যেবেলা আশ্চর্য হতে ইচ্ছে করে। সেন্ট্রালে নামি আমরা। হেঁটে পুঁটীরামে পৌঁছে একটু কচুরি-ডাল আঙুলে লাগিয়ে গল্প করি খানিক। 'আর কত ছোট হবে, হে ঈশ্বর?', শঙ্খ ঘোষের শব্দগুলো বদলে নিয়ে, কচুরির চেহারা নিয়ে একটু মজা করতে করতে ভাবি এ শহর, আমাদের চারপাশ আর আমাদের আশ্চর্য হতে শেখায় না। কালিকায় ফিস ফিঙ্গার নিই দুজনে; সাথে একটু কাটলেট। আমাদের জন্য কোন আশ্চর্য মুহূর্ত আর অপেক্ষা করে নেই। কলেজ স্কোয়ারে ঢুকে যাই।
"এটা আমার ছোটবেলার পাড়া; বহুদিন পর এলাম রে, ভাই।", এই বলে হঠাৎ দেখি "Members Only" লেখা swimming club-র একটা দরজার দিকে হাঁটা লাগিয়েছে।
"আরে, দাঁড়াও। কোথায় যাচ্ছ?", আমি বলতে বলতেই সেসব শোনার আগে ততক্ষণে ভেতরে একটা পুলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে। "এটা novice-দের, আর আর...", এই বলে ছুটে সটান বাইরে। আমিও পেছন পেছন ছুটি। "এটায় একটু শিখলে তারপর পাঠাত। এটা বেশী গভীর।"
আলো জ্বলে ওঠে কলেজ স্কোয়ারে আর তখনই হঠাৎ পুলের গভীর জল না কোথা থেকে যেন, সুশান্ত দা'র কাছে এই সমস্ত আশ্চর্য উঠে আসে।ছোটবেলার অবাক আশ্চর্য। মোবাইলে ছবি উঠে যায় একের পর এক, শুধু একটা সুইমিং পুলের। আমি বুঝতে পারি, পার্ক স্ট্রিটে কেন সন্ধ্যেবেলা এখনও হাঁটলে আমারও 'আশ্চর্য নতুন ভাবে' কিছু না কিছু দেখা হয়ে যায়। "লাল ফিতে, সাদা মোজা, স্কুল ইউনিফর্ম" পেরিয়ে কখনও মনে হয়, সমস্তই কি যায়?
কফি হাউসে বসে খুব গরম লাগে। কর্পোরেট জীবনের দখলদারি এভাবে নেমে এল তবে? আমরা নিজেদের প্রশ্ন করি। এতক্ষণে আমার আশ্চর্য হওয়ার সময় আসে। এরপর হাতিবাগান অবধি হেঁটে যেতে যেতে মনে পড়ে, কীভাবে খরচ বেড়ে চলেছে নিয়মমাফিক। Lifestyle inflation নিয়ে, multiple income stream নিয়ে, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত আসলে যে অঙ্কের চেয়েও মনস্তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় - তা নিয়ে আর এসব বিষয়ে YouTuber-দের জালিয়াতি নিয়ে পড়িয়ে চলেছি প্রত্যেকদিন- লক্ষ্মী নারায়ণ সাউয়ের দোকানে কাশ্মীরী আর আমের চপের তেল কাগজের ঠোঙায় মুছতে মুছতে সেকথাও বলি।
ততক্ষণে হাতিবাগান আরসালান। কিমা কারি নিই আমরা ; বাড়ি ফিরে খাব। খাব কি আদৌ আজ? "
"বাড়ি ফিরে কী করবি? গান? রাতে হচ্ছে নাকি আজ অল্প করে? "
"না, না, পাগল? চল, শ্যামবাজার দিয়ে ফিরবে তো? একটু পা টানছে এবার।"
আসলে, কীভাবে ও কেন আমরা কথা বলার বিষয় হারিয়ে, অন্যকে সুস্থ করার ইচ্ছে হারিয়ে আস্তে আস্তে আমাদের আড্ডার ফাঁকা সময়টুকুও, একসাথে কাটানো সময়টুকুও খাদ্য আর পানীয়ে কিংবা নেটফ্লিক্স দিয়ে ভর্তি করছি - এসব কথাই ফিরে ফিরে আসে কফি ও কবিতায় ইনফিউশন খেতে খেতে।
"আজ আর চিত্তরঞ্জন, ভবতারিণী ডাকছেন না। বুঝলে তো? অন্যদিন"।
একদম। কিছু পিছুটান ছেড়ে যাওয়া ভালো।

8 November 2022



Comments

Popular posts from this blog

অনাদায়

  ১। যে আঁচেতে পুড়ে যাওয়া একটু একটু করে, সে আগুন তোমার তো নয় জানি। তবে? বসুধা কুটুমবাড়ি, অতএব পুড়ে যেতে হবে। কোথায় জ্বলছে পেট, কোথায় চাকরি, বাড়ি, যেদিকে তাকাই সবাই ছুট্টে আসে, জন্মপঞ্জি নিয়ে। মা বাবার পরিচয় চায়। ওরা বলে, দেখছ না? একই তো পেটের ফল। আর বল্‌, পাপ নিবি কি না? এই পাপ আমাদের একা করে কোন খাদে নিয়ে যাবে, এখনও জানি না।       ২। এমন করলে কেন? বুঝেছিলে মৃত্যু আসীন? এ প্রশ্নে একটি রক্তবাণ বিদ্ধ করে, সমস্ত দিন, সমস্ত রাত নির্ঘুম। দিনে রাতে পেয়াদার ডাক, আড়ং ধোলাই আসে আকাশকুসুমে, থাক থাক, আর মেরো না খোদাতালা, প্রভুর দাসেরে। বল সুবিনীত হবে? হব, তবে তোমার জন্যে এই টক্সিক উপোস-কানুন নেশা জানিনা কিচ্ছুটি, শেষ হবে কবে।     ৩। নিজের দূরাত্মীয়, সেই হল এখন প্রথমা। ভেবেছিলে সেটাই দায়িত্ববোধ। একবার হাত পাতলে সেই হাত ফিরে ফেরে, সেটা জানতে না বুঝি? বলেছিল তোমার আত্মজ। আসল আত্মীয় কে? অন্য কেউ? দুরাত্মা? জারজ?     ৪। এটুকু কিছুই নয়। ঢের বাকি আছে। সামাজিক অপমান , পুলিশ , আদালত , পাড়াছাড়া। র...

পাড়া ক্রিকেট

  নিয়ে আয় খেলোয়াড়ি বল, উড়ুক তুফানে উইকেট‌; আগেভাগে পিচটিচ ঠিক কর তোরা – আমার উদ্যানে। বাড়ির সামনে চেঁচা উত্তাল - "ভাই, ভাই ওটা পায়ে‌ লেগেছিল", ভেঙে ফ্যাল আমাদের নিশ্চুপ পাড়ার বিকেলঘুম, নিজের দিকেতে শাসানির চারটে আঙুল, আর বিরুদ্ধতার তর্জনী। আমাদের শীতকাল, বয়স বিরুদ্ধতা জুড়িয়ে উঠুক, জুড়িয়ে উঠুক সব বন্ধুতা বিচ্ছেদ, চাকরির অপলাপ এইচ-আর সালিশী সভা; আর জুড়িয়ে তুবড়ে দে, দে তো‌ দেখি, হিংসুটে দৈত্যের বাগানেতে অপ্রতিম কাঁটাগাছ, আর ভেতরেতে নুয়ে পড়া করুণ জবা। মধ্যবয়সে যারা বুড়ো ভাম, ভীমরতি প্রাপ্তির সামান্য দূরে – এটুকু মানতে পারি, আমাদের বাপ, মা, কাকারাই পাড়ায় পাড়ায় আদরে, বেনামে, কালো টাকা আর সবুজ উদ্যানে, ফেলেছে সিন্ডিকেট, নির্মিয়মাণ ফ্ল্যাট, ফণীমনসার কাঁটা বেড়ার স্তবক। এখন বিকেল হল। আমার পাড়াকে তোরা টেনে আন উদ্যানে। আমাদের আওয়াজের ভদ্রতা ভয়টুকু ব্যাটেতে, বলেতে নাচা- "আউট, আউট"। শেখা ঢের বাকি আছে নীতি বা সবক। ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

সুসংবাদ, এসো

সুসংবাদ আর আসেনা  আর সত্যিই আসেনা আমার এই দিনানুদিনে। অতএব, আমি তো সত্যিই এই ঝাকানাকা অতীতবিলাসটুকু ভাঙিয়ে খাই‌। আর মেয়ে পটাতে গিয়ে বলি, মাত্র পনেরোতে,  মানে তাও তো পনেরো হল, সুনীল গাঙ্গুলী আমাকে একদিন পিছলে পড়ে স্কচ খাইয়ে, নাকি কৃত্তিবাসে কবিতা ছাপিয়ে দেবে বলেছিল। হেঁ, হেঁ... কেউ কথা রাখেনি। কেউ কি রাখে? তাও তো হাফে... হাফ হাতা, শালা,  হাঁটুর বয়সে... খুশি। খুশি, মেড়ো মাল  নতুন বাংলা লিখা শিখেছে হাঁটুর বয়সে,  এই তো ইদ্রিস ওর হাঁটুর বয়সে, ব্যথা, বিয়ে হবে ওদের।  প্রজাপত্য। আর লেখা ছাপা হবে আনন্দ...আনন্দ, দেশ, আমাদের দেজ... এসো, সীমাহীন সুসংবাদ, এসো সুসংবাদ, এসো! ১৮ এপ্রিল,‌ ২০২৬