Skip to main content

"অপূর্ব সে আলো"

 কিছু কিছু ক্ষত মানুষকে এক দিব্য আলো দেয়। কাছের মানুষের ছেড়ে যাওয়া, অনিচ্ছাসত্বেও চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হওয়া, মেট্রো বা বাসে অপমানের কালশিটে একেকটা দিনের পর কবিতার কাছাকাছি নিয়ে আসে। "পরিবার আর কাজের মধ্যে বাছতে গিয়ে আমাকে দ্বিতীয়বার ভাবতে হয়নি, স্বর্ণদীপ", স্যার বলছিলেন সেদিন, "আর তাছাড়া, আমিও কি আর আগের মত ভাষাটাকে স্বচ্ছন্দে বলতে পারি?"

এরকমও হয় তবে? আমাদের কম বয়সের তারকারা কেউ সেলিব্রিটি ছিলেন না। অনেকে ছিলেন, তবে অঞ্জন দত্তের মতই কেউ কেউ সেভাবে চান নি রাতারাতি সেলিব্রিটি হয়ে যেতে। তবে আমাদের তারকারা শিক্ষক ছিলেন, যারা একটা বিষয় শেখাতেন না; কীভাবে ভাবতে হয় সেটা শেখাতেন, ভালো - খারাপ দুটো সবসময় নৈর্ব্যক্তিক বিষয় নয় বরং অন্যের কথা ভেবে কিছু বড় সিদ্ধান্তের কাছে, ছোট সত্যি পেরিয়ে বৃহত্তর সত্যের কাছে নত হতে হয় এটা বোঝাতেন। তাই এরা সবাই যে প্রচারের প্রাচুর্য্যে অনেক এগোতে পেরেছেন তা নয়, কিন্তু কখনও অন্যের স্বাছন্দ্যে আজকের intelligentsia - র মত কর্পোরেটকে অথবা "সব অধঃপাতে গেল" বলে প্রতি মুহূর্তে আজকের সময়টাকে, প্রজন্মকে গালি দেননি। তারা ছোট একটা জিনিস বুঝতে পারেন - সবই থাকবে, তবে পাশাপাশি থাকতে হবে। সহাবস্থান জরুরী। আর অন্যটা? It's just not my way. আমি আমার পথটাকে, মতটাকে মেনে নেব। আমার কাছে কেউ এলে তাকেও এটুকুই বলব যে, এটা শুধুমাত্র আমার দেখা, আমার বোধ। এটাই তাদের আলো- স্বাছন্দ্যের আলো, ঘৃণাকে এক লহমায় ফিরে যেতে বলার আলো (বুদ্ধ যেমন মারকে বলেছিলেন, তোমার এই ঘৃণা আমি ফিরিয়ে দিলাম), অথবা নিজের প্রয়োজনটুকু সমাজের শেখানো প্রয়োজন থেকে আলাদা করতে পারার আলো।
এক একদিন সন্ধ্যেবেলা এদের কাছে বসি। এদের সাথে ফোনে ঘণ্টাখানেক কথা বলতে বেশ ইচ্ছে হয় অফিসের পর। এসব কথা-আলাপ দিয়ে নিজেকে সুস্থ রাখি। "কোথায় বসছি আমরা?" - "বাড়িতেই হতে পারে, স্যার।" - "সাউথ সিটি যাবে? তোমাকে অনেকদিন খাওয়ানো হয়নি। সত্যি বলতে, কোনদিনই খাওয়ানো হয়নি।"
সেসব সন্ধ্যেবেলা যাদবপুরের একনম্বর গেট পেরিয়ে চার নম্বর দিয়ে বেরোতে বেরোতে দেখা হয় আমার ২০১২-২০১৪- র সাথে। Green zone , একটা গোলপার্কে দুপুর বেলা পড়াতে যাওয়া, শেষে ওকে নিয়ে সাদার্ণ এভ্যিনিউ হয়ে কালীঘাট মেট্রো অবধি হাঁটা, মাঝে লায়ন্স পার্ক, সরোবরে চুমুর পর বিভোর কিছু কিছু বাস্তবিক আশ্বাসে নিজের সাথে কথা বলতে বলতে ফিরে আসা Culture Française -র ক্লাসে কিছু অবিশ্বাস্য ফরাসী গান, কবিতায় সময় কাটাবো বলে, কিছুক্ষণ নিজেকে ২১শতকের troubadour মনে হবে বলে - এসব নিয়ে সাউথ সিটির কফি ওয়ার্ল্ডে বসি। অনেক কথা হয় আমাদের - আমাদের নিজেদের সাথে আর একে অন্যের সাথে। আসলে যেসব কথা আগেও হয়েছে, 'আন্তরিক পর্যটনে', তার ওপর একটা নতুনের প্রলেপ দিই আমরা। বুঝে নিই যে, ২০১২ তে আমাদের যেটুকু কথা হয়েছিল সেটুকু এখনও আছে, বরং অনেক বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। Academics - ছেড়েছিলাম একটা অবস্থাকে দিন দিন দেখতে পাচ্ছিলাম, আর নিজের ভেতরেই ভেঙ্গেচুরে যাচ্ছিলাম বলে। এসব আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
রাতে বাড়ি ফিরি। মনে পড়ে, কয়েকদিন আগেই আরেক স্যারের সাথে কথা হচ্ছিল ফোনে। তিনি আমাকে কোনদিন সরাসরি পড়ান নি। কিন্তু তবুও স্যার, কিছুটা অলক্ষ্যেই। আমার থেকে পরিষ্কার আর স্বচ্ছ দেখেন কি না? উনি আমাকে বলেন, "স্কুলের অ্যাডমিন নিশ্চয় এদের (বাবা-মায়েদের) ক্লায়েন্টই ভাবে কিন্তু মজা হচ্ছে, জান, এটা বোধহয় একমাত্র উদাহরণ যেখানে your clients are not aware of the products, suitable to their needs. তুমি এদের ক্লায়েন্ট বল, স্বর্ণদীপ?"
১১ ডিসেম্বর, ২০২২

Comments

Popular posts from this blog

অনাদায়

  ১। যে আঁচেতে পুড়ে যাওয়া একটু একটু করে, সে আগুন তোমার তো নয় জানি। তবে? বসুধা কুটুমবাড়ি, অতএব পুড়ে যেতে হবে। কোথায় জ্বলছে পেট, কোথায় চাকরি, বাড়ি, যেদিকে তাকাই সবাই ছুট্টে আসে, জন্মপঞ্জি নিয়ে। মা বাবার পরিচয় চায়। ওরা বলে, দেখছ না? একই তো পেটের ফল। আর বল্‌, পাপ নিবি কি না? এই পাপ আমাদের একা করে কোন খাদে নিয়ে যাবে, এখনও জানি না।       ২। এমন করলে কেন? বুঝেছিলে মৃত্যু আসীন? এ প্রশ্নে একটি রক্তবাণ বিদ্ধ করে, সমস্ত দিন, সমস্ত রাত নির্ঘুম। দিনে রাতে পেয়াদার ডাক, আড়ং ধোলাই আসে আকাশকুসুমে, থাক থাক, আর মেরো না খোদাতালা, প্রভুর দাসেরে। বল সুবিনীত হবে? হব, তবে তোমার জন্যে এই টক্সিক উপোস-কানুন নেশা জানিনা কিচ্ছুটি, শেষ হবে কবে।     ৩। নিজের দূরাত্মীয়, সেই হল এখন প্রথমা। ভেবেছিলে সেটাই দায়িত্ববোধ। একবার হাত পাতলে সেই হাত ফিরে ফেরে, সেটা জানতে না বুঝি? বলেছিল তোমার আত্মজ। আসল আত্মীয় কে? অন্য কেউ? দুরাত্মা? জারজ?     ৪। এটুকু কিছুই নয়। ঢের বাকি আছে। সামাজিক অপমান , পুলিশ , আদালত , পাড়াছাড়া। র...

পাড়া ক্রিকেট

  নিয়ে আয় খেলোয়াড়ি বল, উড়ুক তুফানে উইকেট‌; আগেভাগে পিচটিচ ঠিক কর তোরা – আমার উদ্যানে। বাড়ির সামনে চেঁচা উত্তাল - "ভাই, ভাই ওটা পায়ে‌ লেগেছিল", ভেঙে ফ্যাল আমাদের নিশ্চুপ পাড়ার বিকেলঘুম, নিজের দিকেতে শাসানির চারটে আঙুল, আর বিরুদ্ধতার তর্জনী। আমাদের শীতকাল, বয়স বিরুদ্ধতা জুড়িয়ে উঠুক, জুড়িয়ে উঠুক সব বন্ধুতা বিচ্ছেদ, চাকরির অপলাপ এইচ-আর সালিশী সভা; আর জুড়িয়ে তুবড়ে দে, দে তো‌ দেখি, হিংসুটে দৈত্যের বাগানেতে অপ্রতিম কাঁটাগাছ, আর ভেতরেতে নুয়ে পড়া করুণ জবা। মধ্যবয়সে যারা বুড়ো ভাম, ভীমরতি প্রাপ্তির সামান্য দূরে – এটুকু মানতে পারি, আমাদের বাপ, মা, কাকারাই পাড়ায় পাড়ায় আদরে, বেনামে, কালো টাকা আর সবুজ উদ্যানে, ফেলেছে সিন্ডিকেট, নির্মিয়মাণ ফ্ল্যাট, ফণীমনসার কাঁটা বেড়ার স্তবক। এখন বিকেল হল। আমার পাড়াকে তোরা টেনে আন উদ্যানে। আমাদের আওয়াজের ভদ্রতা ভয়টুকু ব্যাটেতে, বলেতে নাচা- "আউট, আউট"। শেখা ঢের বাকি আছে নীতি বা সবক। ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

সুসংবাদ, এসো

সুসংবাদ আর আসেনা  আর সত্যিই আসেনা আমার এই দিনানুদিনে। অতএব, আমি তো সত্যিই এই ঝাকানাকা অতীতবিলাসটুকু ভাঙিয়ে খাই‌। আর মেয়ে পটাতে গিয়ে বলি, মাত্র পনেরোতে,  মানে তাও তো পনেরো হল, সুনীল গাঙ্গুলী আমাকে একদিন পিছলে পড়ে স্কচ খাইয়ে, নাকি কৃত্তিবাসে কবিতা ছাপিয়ে দেবে বলেছিল। হেঁ, হেঁ... কেউ কথা রাখেনি। কেউ কি রাখে? তাও তো হাফে... হাফ হাতা, শালা,  হাঁটুর বয়সে... খুশি। খুশি, মেড়ো মাল  নতুন বাংলা লিখা শিখেছে হাঁটুর বয়সে,  এই তো ইদ্রিস ওর হাঁটুর বয়সে, ব্যথা, বিয়ে হবে ওদের।  প্রজাপত্য। আর লেখা ছাপা হবে আনন্দ...আনন্দ, দেশ, আমাদের দেজ... এসো, সীমাহীন সুসংবাদ, এসো সুসংবাদ, এসো! ১৮ এপ্রিল,‌ ২০২৬