Skip to main content

শীত এলেই এইসব মনে পড়ে

 শুনছি পশ্চিমী ঝঞ্ঝা কেটে কলকাতায় শীত নামবে আগামী সপ্তাহে। এর মধ্যেই বো-ব্যারাক সেজে উঠবে একটু একটু। যুগাবতার অথচ শীর্ণ ও নিঃসঙ্গ বাড়িগুলোর সামনে ফুটপাতে বসবে একটা দুটো চেয়ার-টেবিল, খাওয়ার দোকান। রাস্তায় খেলতে খেলতে মুখ থুবড়ে পড়বে জর্জিনার ছেলেমেয়েরা, আর জর্জিনা ginger wine বানাতে বানাতে বাড়ির বারান্দায় ছুটে এসে চিৎকার করবে, "Will you stop meddling with Goldie's tail? Come inside, I say!"

ফুলিয়া থেকে ছানা এসেছে আজ J.N Barua-র দোকানে।
রতনবাবুর সহকারী বললেন, "দাদা গরম লাগছে আপনার? ভেতরে এসে বসুন।"
"না, ওই কলেজ স্ট্রিট থেকে হাঁটছি কিনা।"
"আরে আসুন না। প্যাটিস গরম হচ্ছে ; বসে খান।"
"হ্যাঁ, শীতই তো পড়ছে না কলকাতায়", আমি বলি।
প্লাস্টিকের কাপে চা আসে ওঁদের জন্য সামনের কোন বাড়ি থেকে। আমি বলি, "ছানার কেক হয়েছে?"
"এই তো আপনার সামনেই এল। কাল পাবেন। কাল থেকে আর দাঁড়ানোর জায়গা পাব না, দাদা। দোকান ভর্তি কার্টুন।"
ততক্ষণে রতন বাবু ছানার হিসেব-নিকেশ শুরু করেছেন করেছেন। আমি চিকেন প্যাটিস শেষ করে হাঁটা লাগাই ডেকার্স লেনের দিকে।
Earphone ছাড়াই আস্তে আস্তে এবার শুনতে পাচ্ছি, Anjan Dutt -এর
"ফেলে আসা পুরোনো সে পাড়া, লোহা ঘোরানো সিঁড়ি
পেছনের দরজায় কড়া নাড়া, হাতে নিয়ে আমার Christmas Tree
সারা ঘরের মোমবাতির আলোয় দাঁড়িয়ে তুমি
আর পুরোনো গ্রামোফোনে
আমাদের ফেলে আসা বড়দিন..."
ততক্ষণে গণেশ চন্দ্র এভিনিউ, সেন্ট্রাল এভিনিউ, রফি আহমেদ কিদয়াই স্ট্রীট, মির্জা গালিব স্ট্রীট, বস্টন, প্যারিস, কোপেনহেগেন থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে লোক নেমে এসেছে রাস্তায়। ঘরে ফিরছে কিছু লোক জোসেফাইন নুডলস্ আর পর্ক ওয়ান্টন নিয়ে। এই কলকাতার মধ্যে হরেক কিসিমের কলকাতা‌। এক flaneur দেখছে সুভাষ মুখোপাধ্যায় হেঁটে চলেছেন বজবজের দিকে জয় গোস্বামীকে নিয়ে।
"কী আছে ওখানে দেখার?"
"মানুষ।"
মানুষ। কত রকমের মানুষ, তাদের স্বপ্ন, ছোট ছোট আকাশ-কুসুম ইচ্ছেরা, রাতের আশ্রয়ে বিছানার চাদর আর তার ওপরে তৈরি কতরকম art, কত ভাস্কর্য! আর খামখেয়াল। মালদায় গ্রামের দিকে বলতে শুনেছি, 'খাম হয়ে গেছে' অর্থাৎ আহত হয়েছে। মানুষের এই খেয়াল গুলোকে 'খাম-খেয়াল' ছাড়া আর কি বলি! এ খেয়ালেরা সারাজীবন আহত করে যাবে, রক্তাক্ত করে যাবে আর তাই ঋদ্ধ করবে ; পৌঁছে দেবে শুদ্ধতার খুব কাছাকাছি।
ডেকার্স লেনে পৌঁছেছি। "পেয়ে যাব এককাপ চা রাস্তায়।" ডেকার্স লেনের গলির সামনে কাগজের কাপে নয়, এমনকি মাটির ভাঁড়েও নয়, কাপ-প্লেটে চা আর একটা বাদাম বিস্কুট।
জীবনের এ যে কী আশ্চর্য বিলাসিতা, এ আমি কাকে বলি, বলুন তো?

December 2021



Comments

Popular posts from this blog

অনাদায়

  ১। যে আঁচেতে পুড়ে যাওয়া একটু একটু করে, সে আগুন তোমার তো নয় জানি। তবে? বসুধা কুটুমবাড়ি, অতএব পুড়ে যেতে হবে। কোথায় জ্বলছে পেট, কোথায় চাকরি, বাড়ি, যেদিকে তাকাই সবাই ছুট্টে আসে, জন্মপঞ্জি নিয়ে। মা বাবার পরিচয় চায়। ওরা বলে, দেখছ না? একই তো পেটের ফল। আর বল্‌, পাপ নিবি কি না? এই পাপ আমাদের একা করে কোন খাদে নিয়ে যাবে, এখনও জানি না।       ২। এমন করলে কেন? বুঝেছিলে মৃত্যু আসীন? এ প্রশ্নে একটি রক্তবাণ বিদ্ধ করে, সমস্ত দিন, সমস্ত রাত নির্ঘুম। দিনে রাতে পেয়াদার ডাক, আড়ং ধোলাই আসে আকাশকুসুমে, থাক থাক, আর মেরো না খোদাতালা, প্রভুর দাসেরে। বল সুবিনীত হবে? হব, তবে তোমার জন্যে এই টক্সিক উপোস-কানুন নেশা জানিনা কিচ্ছুটি, শেষ হবে কবে।     ৩। নিজের দূরাত্মীয়, সেই হল এখন প্রথমা। ভেবেছিলে সেটাই দায়িত্ববোধ। একবার হাত পাতলে সেই হাত ফিরে ফেরে, সেটা জানতে না বুঝি? বলেছিল তোমার আত্মজ। আসল আত্মীয় কে? অন্য কেউ? দুরাত্মা? জারজ?     ৪। এটুকু কিছুই নয়। ঢের বাকি আছে। সামাজিক অপমান , পুলিশ , আদালত , পাড়াছাড়া। র...

পাড়া ক্রিকেট

  নিয়ে আয় খেলোয়াড়ি বল, উড়ুক তুফানে উইকেট‌; আগেভাগে পিচটিচ ঠিক কর তোরা – আমার উদ্যানে। বাড়ির সামনে চেঁচা উত্তাল - "ভাই, ভাই ওটা পায়ে‌ লেগেছিল", ভেঙে ফ্যাল আমাদের নিশ্চুপ পাড়ার বিকেলঘুম, নিজের দিকেতে শাসানির চারটে আঙুল, আর বিরুদ্ধতার তর্জনী। আমাদের শীতকাল, বয়স বিরুদ্ধতা জুড়িয়ে উঠুক, জুড়িয়ে উঠুক সব বন্ধুতা বিচ্ছেদ, চাকরির অপলাপ এইচ-আর সালিশী সভা; আর জুড়িয়ে তুবড়ে দে, দে তো‌ দেখি, হিংসুটে দৈত্যের বাগানেতে অপ্রতিম কাঁটাগাছ, আর ভেতরেতে নুয়ে পড়া করুণ জবা। মধ্যবয়সে যারা বুড়ো ভাম, ভীমরতি প্রাপ্তির সামান্য দূরে – এটুকু মানতে পারি, আমাদের বাপ, মা, কাকারাই পাড়ায় পাড়ায় আদরে, বেনামে, কালো টাকা আর সবুজ উদ্যানে, ফেলেছে সিন্ডিকেট, নির্মিয়মাণ ফ্ল্যাট, ফণীমনসার কাঁটা বেড়ার স্তবক। এখন বিকেল হল। আমার পাড়াকে তোরা টেনে আন উদ্যানে। আমাদের আওয়াজের ভদ্রতা ভয়টুকু ব্যাটেতে, বলেতে নাচা- "আউট, আউট"। শেখা ঢের বাকি আছে নীতি বা সবক। ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

সুসংবাদ, এসো

সুসংবাদ আর আসেনা  আর সত্যিই আসেনা আমার এই দিনানুদিনে। অতএব, আমি তো সত্যিই এই ঝাকানাকা অতীতবিলাসটুকু ভাঙিয়ে খাই‌। আর মেয়ে পটাতে গিয়ে বলি, মাত্র পনেরোতে,  মানে তাও তো পনেরো হল, সুনীল গাঙ্গুলী আমাকে একদিন পিছলে পড়ে স্কচ খাইয়ে, নাকি কৃত্তিবাসে কবিতা ছাপিয়ে দেবে বলেছিল। হেঁ, হেঁ... কেউ কথা রাখেনি। কেউ কি রাখে? তাও তো হাফে... হাফ হাতা, শালা,  হাঁটুর বয়সে... খুশি। খুশি, মেড়ো মাল  নতুন বাংলা লিখা শিখেছে হাঁটুর বয়সে,  এই তো ইদ্রিস ওর হাঁটুর বয়সে, ব্যথা, বিয়ে হবে ওদের।  প্রজাপত্য। আর লেখা ছাপা হবে আনন্দ...আনন্দ, দেশ, আমাদের দেজ... এসো, সীমাহীন সুসংবাদ, এসো সুসংবাদ, এসো! ১৮ এপ্রিল,‌ ২০২৬