শীত এলেই অনেকটা আত্মগত হই ; অনেকটা অন্তর্মুখী হই। কলেজ স্ট্রিটে, নন্দন চত্বরে দুপুর কাটাতে ইচ্ছে করে। চলেও যাই এমন একেকটা সকালে, দুপুরে। আজ যাব। একক। বাংলাদেশ বইমেলা তো অজুহাত মাত্র। অনেক দীর্ঘাঙ্গ মানুষের হেঁটে যাওয়া দেখতে দেখতে মনে হবে, ঐ তো পুরনো বইয়ের দোকানে সত্যজিত রায় বই ঘেঁটে দেখেছেন। শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায় হেঁটে যাচ্ছেন ভারবি থেকে অন্য প্রকাশনার দপ্তরে একতাড়া প্রুফের কাগজ নিয়ে। ঘোলাটে মোটা চশমার ফ্রেম। প্যারামাউন্ট থেকে বেরিয়ে আসছেন সেকালের তাবড় অভিনেতা কেউ। তাঁকে দেখতে ভিড় জমছে বাইরে। এসব হবে। কলকাতায় এখনও এসব হয়ে যাবে বলেই শীতের বিকেল শেষে নেমে আসবে অলৌকিক আলো।
কাল দে'জ প্রকাশনীর বিদ্যাসাগর টাওয়ারের দোকানে বসে কবিতা উৎসবে জয় গোস্বামীকে শুনতে শুনতে এসব কথাই মনে হচ্ছিল। "কলেজ ষ্ট্রিটে সত্তর বছর" কাটানো সবিতেন্দ্রনাথ রায়ের মতই, আমাদের মত অনেক মানুষের স্মৃতিতে জয় নির্মাণ করছিলেন দীর্ঘ কবিতাযাপনের ইতিহাসকে। রবীন্দ্রনাথ পেরিয়ে কখন যে একেকটা যুগকে ডেকে আনছিলেন জয় তুষার চৌধুরীর "ট্রাঙ্ককল" কবিতার মত! অরিত্র সান্যালের সমাপনহীন কবিতার সূত্র বারবার ঢুকে গেল তাঁর 'এলোমেলো পাঠভ্রমণে'। সমস্ত কবিতাই অসমাপ্ত কবিতা- এ কথা নানা ভাবে ফিরে ফিরে এল। জয় টেনে আনলেন সিনেমার কথা যেখানে, Surviving Picasso -তে Anthony Hopkins, Picasso- র চরিত্রে বলে ওঠেন, সমস্ত ছবিই তো আসলে অসমাপ্ত ছবি। উঠে এল Aeschylus -এর Orestia থেকে, স্পেনীয় সাহিত্যে নৈর্ব্যক্তিক এবং আত্মমুখী কবিতার কথা। উৎপলকুমার বসু, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত পেরিয়ে চলে এলেন আজকের চৈতালি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায়। দেখাতে থাকলেন, কবিতা কীভাবে পড়তে হয়। বললেন, 'আমার মুখের দিকে দেখবেন না। আমার কথা শুনতে শুনতে স্ক্রিনে কবিতাটি লক্ষ্য করুন।' অনায়াসে তুলে আনলেন এক নারীর সারা জীবনের বাঁধন-চর্চার গল্পটুকু কীভাবে কবিতার শরীরে আটকে যায়। অভীক মজুমদারের "মেরুদণ্ড" কবিতায় কীভাবে "মেরুদণ্ড" শব্দটি কবিতার গঠনের মেরুদণ্ড হিসেবে ধরে রাখে আর কবিতার গায়ে আগুন লেগে যাওয়ার পর কেমন নিমেষে ওলটপালট হয়ে যায় সেই মেরুদণ্ডের ঋজুতা। যশোধরা রায়চৌধুরীর কবিতায় ঠাট্টা করে বলে ফেলা আত্মহত্যা অথবা কাছের মানুষকে হারানোর অমোঘ ট্রাজেডির চোরাস্রোতের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন জয়। গলা বুজে আসে। কলেজ স্ট্রিটে একঘর মানুষ দেখে, কেন বুদ্ধদেব বসুর এক কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধ, প্ল্যাটফর্ম চত্তরে পড়তে পড়তে একদিন অনেকবছর আগে হঠাৎই রানাঘাটের এক তরুণ ঠিক করে ফেলেছিলেন - কবিতা নিয়েই ঘর করা যায়।
জয় গোস্বামী যদি "গোঁসাইবাগান" না লিখতেন, জানিনা কতটা আজ কবিতা পড়ার মত যোগ্যতা তৈরী হত আমাদের অনেকেরই। এ বই শিয়রে জাগা বই ; স্মৃতিতে আঁকড়ে রাখা আমার কতিপয় বইয়ের মধ্যে একটি। এই স্মৃতি নিয়েই জয় কাল সন্ধ্যেতে, ওঁর ভাষায় 'তেমন প্রস্তুতি ছাড়া'-ই, সম্মোহিত করে রাখেন ঘণ্টা দুয়েক, হয়তো তারও কিছু বেশি। বিষ্ণু দে-র বন্ধু বিয়োগের পর (সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মৃত্যুতে) প্রৌঢ়ত্বের "বদ্বীপে" দাঁড়িয়ে থাকার সাথে বিনয় মজুমদারের ছাব্বিশ বছর বয়সে লেখা নারীর ত্রিবলীর চিত্রকল্পে "আশ্চর্য ব-দ্বীপ"-এর উল্লেখ, ছোট্ট একটা হাইফেনের প্রয়োগে কবিতার ম্যাজিক-মুহূর্ত নির্মাণে অবাক হওয়ার পুরো যাত্রায় জয় আমাদের নিয়ে যান সাথেই, হাত ধরে ধরে।

Comments
Post a Comment