আজ সারা সকালটা ওঁকে বসে বসে দেখলাম। এই যে মানুষটি শীতের বিষণ্ণ গাছের মত তাকিয়ে দেখছেন তাঁর শেষের পৃথিবীকে, এও এক দেখার মত আলো।
"কে রে, সন্তু না কি? এখন ভালো দূরের জিনিস দেখতে পাই না রে। কী হল, চিনতে পারছিস না?"
আমি উত্তর দিই; সে উত্তর ওঁর কাছে পৌঁছোয় না। উনিও কিছু বলতে থাকেন আমার জন্য। সে কথা আমার কাছে আসতে পারে না আর। শব্দ শুকিয়ে যায়, শরীরের মতই। এই সমস্ত একমুখী সংলাপ নিয়ে জীবনযাপন করা ওঁকে কখনও কখনও দেখতে পাই। আজও পায়চারি করছেন এমন এক বাগানে, যা কোনদিনই সাজানো হয়নি তাঁর জীবদ্দশায়। কংক্রিটের বাগানকে পরিষ্কার রাখার জন্য যত্নে কুড়িয়ে নিচ্ছেন আসন্ন শীতের আগের শুকনো পাতা। অনেকেরই এমন একটা বাগান করার শখ থাকে। আমারও ছিল।
শীত এলেই এখনও কলকাতার গলি, পথ, রাস্তাঘাটের সাথে 'আশ্চর্য নতুনভাবে দেখা' হয়ে যায়। যে দোকান পাড়ার গলির শেষে, পেরিয়ে বেড়িয়ে যাই প্রতিদিন, সেখানে বেড়িয়ে আসি। বেগুনি, আলু, ফুলকপির চপ, ঝালবড়া খুঁজি। সিকিম হাউসে মোমো খেতে না যাওয়ার আফসোস নিমেষে উড়িয়ে নেয় নেভি কাট। "তালপুকুর স্ট্যান্ডের পাশে খাবি,ভাই। কুঙ্গা-টুঙ্গা ফেল। চল্লিশ টাকায় ছ'টা।"
বেশি দূরে যেতে নেই। বেঁধে বেঁধে থাকতে হয়। এসব কথা আসলে এক প্রবল আত্মশ্লাঘা থেকে নয়, বরং কল্পনা বাড়িয়ে সমস্ত জীবন নিংড়ে বাঁচার একটা আবশ্যিক প্রয়োজনীয়তা থেকে আসে। ওঁর মতো। "আমেরিকায় কাজ চলে যাচ্ছে কত, তবে কে যেন বলছিল আমাদের ভয় নেই। বাবুরা সব এদিকে চলে আসবে এবার। এখানেও বোধহয় টাকাপয়সা কম দেবেনা, না?"
শব্দগুলো শুনতে পাচ্ছি। উনি বিড়বিড় করছেন মনে হয়। "এই বাগানটা করা হয়ে উঠল না আর। তবে বাগানটা আছে। বাবু এলে বলব। থাকব তো, না রে?", হাসছেন এবার।
ঐ তো, উনি দেখছেন মা-বুলবুলিকে -- বাচ্চাকে খাইয়ে দিচ্ছে মুড়ি আর বিস্কুটগুঁড়ো। কালকে বিড়ালটা আম গাছে উঠে কাকের বাচ্চা খেয়ে গেছে। এই শরীরে আর গাছে ওঠা যায়না, তাই পাহারা দিতে হবে। আবার আসতে পারে আজ। নাহ্, টগর গাছটা তবু আছে। বছর সাতেক আগে বাবু এসে শেষবার পুঁতে গেছে। সব পাথুরে গল্পকথা নাকি?
25 November 2022

Comments
Post a Comment