মজার কথা হচ্ছে, আমরা যারা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ছোটবেলা থেকে শিখি এবং বেশ মন দিয়ে গাওয়ার চেষ্টা করি, তাদের অনেকেরই অজান্তে ভেতরে ভেতরে সুরপ্রধান নয়, এমন গানের দিকে ঝোঁকটা কমে যায়। আমার এক সিনিয়র গুরুভাই একদিন আমাদের কথায় কথায় একটা খুব জরুরী শিক্ষা দিয়েছিলেন- যাদের সাহিত্যের ওপর, লেখার ওপর নজর থাকেনা তাদের কবীর সুমনের গান ভালো লাগবেনা। অথচ, সুমনের গানে সুরের মুন্সিয়ানার কমতি নেই কিছুই।
RJ অগ্নির সাথে অঞ্জনদা'র একটা ইন্টারভিউ পাওয়া যায় ইউটিউবে, যেখানে উনি নিজস্ব অকপট ভঙ্গিতে স্বীকার করে নেন- 'নচিকেতা, সুমন আর আমার মধ্যে সবচেয়ে musically weak হচ্ছি আমি।' সব মিলিয়ে আমারও স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, অঞ্জন দত্তের সাথে অধিকাংশ বাঙালীর যেভাবে পরিচয় হয়েছে, আমার ক্ষেত্রে তা এইসব স্বাভাবিক কারণেই হয়নি। আমরা যেসময়ের সন্তান, সেখানে সুমন-অঞ্জন- নচিকেতা তিনজনই দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন কলকাতার বাইরে সারা বাংলা, ভারত এবং ভারতের বাইরেও যেখানে যেখানে প্রবাসী বাঙ্গালীরা থাকেন সেই সমস্ত জায়গা। আমি মফস্বলে মানুষ হয়েছি বছর ষোলো অবধি। তবুও, এটা একদমই বিশ্বাসযোগ্য হবে না, যদি আমি বলি যে, সেসময় আমি অঞ্জন দত্তের গান শুনিই নি। পুজোতে, আত্মীয়দের বাড়িতে, স্কুলের থেকে ফেরার পথে জানলা দিয়ে একটুখানি আকাশ দেখতে বসে থাকা মানুষগুলোর বদ্ধ জানালা থেকে, বখাটে দাদার ঠেকে বেসুরো গীটার হাতে একটা সম্পর্ক থেকে আরেকটা সম্পর্কে পুড়তে থাকা কারও ক্ষতের সুরের মত ভেসে আসতেন অঞ্জন দত্ত। ক্যাসেট জড়িয়ে গেলে বিরক্ত হত আমার প্রথম পাপ - মাসতুতো দাদা। এসব অনেক কিছু হত। কিন্তু নাম ছিল, সুর ছিল, মনে কিছুই ছিলনা তখনও। ছিল না কি?
সেদিনও এমন 'দুপুর বেলার রোদ' এসে পড়েছিল 'হেমন্তের হলুদ' জানলায়। দোতলায় একটা ঘরে CRT monitor আর Windows 98 OS-র কম্পিউটার (এখনকার আমি হয়তো Desktop বলবে,যেমন এতক্ষণ বলছিল) ছিল আমাদের। জেঠিমা, আমার দুই জেঠতুতো দিদি, আমার জেঠুর সাথে কোথায় একটা বেড়িয়েছে যেন। বড়পিসি ঘুমোচ্ছেন নিচের তলায়। দোতলার ঘরগুলোর সাথে আমি একা। মেঘ দেখে ভাল্লুক মনে করার বয়স একটু পেরতেই টিন-এজ আঙ্গুল নিশপিশ করে। এই সিডিটা আমাকে দেখতে দেওয়া হয়নি; আজ সুযোগ। কম্পিউটার চলল, তার সাথে চলল আমার জন্য নিষিদ্ধ ভিডিও সিডি। দারুণ লেগেছিল? সত্যিই বুঝেছিলাম? না। কিন্তু নীল দার বানানো, অঞ্জন দার গাওয়া, টাইটেল গানে ছিটকে গেলাম। সেই প্রথম। এরকম হতে পারে গান? আমার জানার বাইরেও আরেক রকম গান? এত সোজাসাপটা ইংরেজীতে একটা গান লিখে ফেলা যায়? Bow Barracks Forever আস্তে আস্তে আমাকে বুঝতে শেখায় যে, আমার শহরের বাইরে, আমার সমাজের বাইরে, আমার জানার বাইরেও আরেকটা জানা আছে। কিন্তু তখনও অঞ্জন দত্তের নামটা খেয়াল করি নি।
খেয়াল করলাম কলকাতায় এসে হাইল্যান্ড পার্ক ফেমে "চলো লেটস গো" দেখতে গিয়ে। তারপর ঘটনাচক্রে জানলাম, এই লোকটির গানই শুনে এসেছি টুকরো টুকরো ভাবে মাঝে মাঝে। এঁরই বানানো সিনেমা আগেও দেখেছি সেই আশ্চর্য রোদেলা দুপুরে। You can't ignore him, right? আর ভাবলাম, ভাই, হচ্ছেটা কী? এই লেভেলের কাজ করে যাচ্ছে দিনের পর দিন কেউ আর এঁকে cultivate করা শুরুই করা হল না আমার?
এভাবেই অঞ্জন দত্ত মিশতে থাকলেন আমার অজান্তেই আমার অনেকখানি নিয়ে। আমি অঞ্জন দত্তকে প্রথমে চিনেছি নির্দেশক হিসেবে, কিছুটা অভিনেতা হিসেবে। ম্যাডলি বাঙালী আর রঞ্জনা দেখার পর মনে হয়েছে,সাবাশ! এরকম স্বচ্ছন্দ আর screen-এ deceptively effortless হয় তাহলে অভিনয়? এর ঠিক পরেই দেখেছি ওঁর প্রথম জীবনের অভিনয়- চালচিত্র, যুগান্ত, অন্তরীণ, গৃহযুদ্ধের মত ছবি, যে সত্যের সাথে, যে সত্তার সাথে অঞ্জন দত্ত আজও অনেক বেশি নিজের কাছাকাছি বলে আমার মনে হয় । আমার নিজের অঞ্জনযাপনে এই অঞ্জন দা-কেই আমি সমস্ত দিয়ে পাই, যেখানে গায়ক,অভিনেতা,নির্দেশক সমস্ত অঞ্জন এখনও একদম নির্যাসটুকু নিয়ে, প্রায় সত্তরের কোঠায় পা দিয়েও, প্রত্যেক মুহূর্তে নিজের দর্শকের কাছে, নিজের কাজের কাছে সৎ থেকে নিজের সেরাটুকু দিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার রেখে যান।
এই সমস্ত মুগ্ধতার পরেও বাকি থেকে একটা ম্যাজিক, একটা 'সেই' -কিছু একটা। আর এটাই ঘটে গিয়েছিল সেদিন আমাদের দেশজ ক্যাফের আড্ডায়। অঞ্জন-দা ধরিয়ে দিলেন কিছু একটা, নির্মাণ করল সেদিনের আড্ডায় যারা এসেছিলেন তারা মিলে। আমার মত কেউ কেউ বসে শুনল পুরোটা কারণ সব সময় বলার কিছু থাকে না। জোর করতে নেই। শোনাটাও কাজ। তারপরে নিজের মধ্যে কিছু কথা তৈরী হবে, নিজের সাথে কিছু কথা তৈরী হবে যেটা নিয়ে আমরা বসে পড়ব আড্ডায়।
কিন্তু এত কথা বলছি কেন? বলছি কারণ, সেদিনের কফি- স্যান্ডউইচের পর, এসব ভেতরে ভেতরে অনেক প্রশ্ন, অনেক তর্ক ভরে দেওয়ার পর অঞ্জন দা একটা নতুন গানের ঝলক দিলেন আমাদের। ঝলক। হঠাৎ গমগম করে উঠল গীটার, একটা আপাত নিরীহ রিদম প্যাটার্ন একদম ফালাফালা করে দিয়ে চলে গেল পরবর্তী দু-তিন মিনিট। এরপর দু'লাইনে, একদম no mincing with words - "আমি জানি এই গানটা না, ভালো হয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি এর একটা ভিডিও শ্যুট করব আমরা।" যাও প্রেমিক, বাড়ি যাও এবার; 'আজীবন অশান্তি ভোগ কর'!
শেষ অবধি বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি আমাদের। আজ শোনা যাচ্ছে পুরনো চাঁদ YouTube -এ নীচের লিংকে -
অবশ্যই শুনুন, এবং অন্যদের শোনান। Earplug বা Bluetooth Speaker জাতীয় কিছু ব্যবহার না করলে এই গানের অভিজ্ঞতার সাথে সুবিচার করা হবে না। অতএব ওটা আবশ্যিক।
এসব গান বানিয়ে টাকা পয়সা হবে না তেমন। সেসব ভাবলে এতদিনে অন্তত 'প্রিয়বন্ধু'র অর্ণব কি আর দিল্লী চলে যেতে পারত না? কিন্তু, কিছু আপোষ না করা কাজ গুলো থেকে যাবে, থেকে যাবে কিছু মূল্যবোধের বেসিকস, সহাবস্থানের ওপর আস্থা, স্বর্গরাজ্য না হতে পারা দুনিয়ায় গান বা কবিতা লিখে যাওয়ার ইচ্ছেগুলো। পুরনো সব কি শুধুই নস্টালজিয়া? না, আসলে একেকটা ভরসার জায়গা? এভাবেই "পুরোনো" শব্দটা অঞ্জন দত্তের কাজে ফিরে ফিরে আসে - 'পুরোনো গীটার' , 'পুরোনো চাঁদ', 'পুরোনো কাঁধ', 'পুরোনো প্রেম 'পুরোনো পাড়া'।
এত কথা লিখলাম, কারণ আজ এই গান শুনতে শুনতে এরকম অনেক বিক্ষিপ্ত কথাই মাথায় আসছিল। "কোথাও শেকড়ে ফিরতে হবে আমাদের", সেদিনের আড্ডায় সুপ্রভাত দা বলেছিলেন। এভাবেই শেকড়ে ফিরব না হয়। ফিরব হয়তো মাত্র আমরা গুটিকয়েক লোক যারা এখনও বিশ্বাস করি পৃথিবীটা তেমন খারাপ, তেমন অন্তঃসার শূন্য, তেমন corrupt হয়ে যায়নি। সময়কে যে অসহ্য মনে হচ্ছে মাঝে মাঝে সেটা শুধুমাত্র এই সময়ের সমস্যা নয়। মধ্যবয়সে আসতে থাকা আমাদের আগের প্রজন্ম বা তার আগের প্রজন্মেরও এক একটা সময় এরকমই কিছু মনে হয়েছে । সময়ের বিবর্তনের সংখ্যাতত্ব অন্য কথা বলে। আর তাই বুড়িয়ে যাওয়া, senile হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে এই লড়াইটা আমরা একসাথে লড়ব। আমরা না চাইলেও অঞ্জন দা তাঁর কিছুটা আয়ু ক্ষইতে দিয়ে আমাদের সাথেই এই কাজটা করে যাবেন। "একজন শিল্পীর এক একটা কাজের আয়ু অন্তত পঞ্চাশ বছর", আমাদের মনে করিয়ে দেবেন তিনি। অতএব, এই কাজটা আমাদের করে যেতে হবে।
আপাতত এই গান লুপে চলবে কয়েকদিন। আমার সাথে কলকাতায় আরও একবার শীতের রাস্তায় রাসেল স্ট্রীট থেকে পার্ক স্ট্রীট হয়ে, মির্জা গালিব বা রিপন ষ্ট্রীট ধরে Bow Barracks অবধি হাঁটবেন অঞ্জন দত্ত।
Comments
Post a Comment