Skip to main content

The Benedetto

 এই দিনগুলোই আচ্ছা রকমের আচ্ছন্ন। কাল দুপুর থেকে বিকেল একটা ঘোরের মধ্যে কেটেছে। কারণ একটা সন্ধ্যেবেলা বাকি। সেই রকম সন্ধ্যেবেলা! ডিসেম্বরের শেষ দুটো সপ্তাহ একটা জ্বরের মত লাগে আমার, যে জ্বরে একটু জড়ানো জড়ানো হাত-পা নিয়ে সন্ধ্যের দিকে ময়দান থেকে পার্ক স্ট্রিটে হাঁটতে বেরোই। সানন্দে কেঁপে কেঁপে উঠি ময়দানের হাওয়ায়, শীতের প্রথম অসমবয়সী প্রেমে চুমুর মত। জ্বরে ভুল বকি ; ভুল দেখি। আমার সামনের পৃথিবীর ছবিটা একটা ওয়েল ক্যানভাসের লেপটে যাওয়া রঙের মত বদলাতে থাকে‌ একটু ‌একটু। সালটা ২০১৭। ডিসেম্বরে ময়দানে একটা আশ্চর্য একলা ঘোড়া শুকিয়ে শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। প্রদোষ পাল তাকে ছবিতে নিয়ে আসছেন ‌শুধু ২০২২-এ ডিসেম্বরে অ্যাকাডেমিতে আমাদের বিষণ্ণ করে দিয়ে যাবেন বলে। কমলালেবু হাতে আমি আমার এক ছাত্রীর কোলে মাথা রেখে ওকে‌ ফার্নান্দো পেসোয়া আর জাক্ প্রেভের পড়াচ্ছি। আমার অযত্নে রাখা চুলে ওর আঙুল খুঁজে নিচ্ছে ময়দানে শেষ বিকেলের ওম্, পুড়ে যাওয়া হোমমেড ব্রাউনির কড়া গন্ধ।ততক্ষণে গণেশ চন্দ্র এভিনিউ, সেন্ট্রাল এভিনিউ, রফি আহমেদ কিদয়াই স্ট্রীট, মির্জা গালিব স্ট্রীট, বস্টন, প্যারিস, কোপেনহেগেন থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে লোক নেমে এসেছে রাস্তায়। ঘরে ফিরছে কিছু লোক জোসেফাইন নুডলস্ আর পর্ক ওয়ান্টন নিয়ে।এই কলকাতার মধ্যে হরেক কিসিমের কলকাতা‌। এক flaneur দেখছে সুভাষ মুখোপাধ্যায় হেঁটে চলেছেন বজবজের দিকে জয় গোস্বামীকে নিয়ে।

"কী আছে ওখানে দেখার?"
"মানুষ।"
তাই তো। বাদল‌ সরকারও তো প্রথম জীবনে অঞ্জন‌দা-কে এই কলকাতাকেই চিনতে বলেছিলেন। তাই না? আর, অবনী সেন? তিনিও রঞ্জনাকে এরকমই কিছু বলেছিলেন না ডেকার্স লেন, টেরিটি বাজার, উত্তর কলকাতার গলির মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে? না কি একা আমিই ভুল দেখছি? আমার একারই‌‌ শুধু এমন সময় এক আদুরে জ্বর আসে?
আমরা যারা অঞ্জন‌দাকে একটা নিজস্ব যাপনে রেখে বড় হয়েছি, তাদের কাছে শীতকাল ‌এলেই শুধু সুপর্ণাকে মনে পড়ে না, বরং অঞ্জন দত্তকেও অবধারিত ভাবে মনে পড়ে। আমি যেহেতু কলেজ‌ জীবনে‌ উঠে প্রথম ওঁর কাজ মন দিয়ে দেখা শুরু করি, তাই ২০১১-১২র পর আমার একটা ক্রিসমাস উইকও ওঁকে ছাড়া কেটেছে কিনা, সন্দেহ আছে। আমার ধারণা, শুধু আমার নয়, এ কথা আমাদের অনেকেরই। ওঁর সিনেমার সামনে, ওঁর গানের সামনে ফিরে ফিরে বসি। মনে পড়ে, হটস্টারের সাবস্ক্রিপশন একবার নিয়েছিলাম কারণ সেবছর ক্রিসমাসে Bow Barracks Forever আরেকবার না দেখে, জাস্ট, থাকতে পারছিলাম না। তাই, নিজের স্বভাবদোষেই কিছুটা, অনেকটা দূর থেকে এভাবেই অঞ্জনদার সাথে একা একা ক্রিসমাস যাপন আমার সেই ২০১২ থেকে । ২০১৮তে এল "বড়দিন" (হিন্দিতে বানানো Bada Din নয়)। হইচইয়ের আমার প্রথম সাবস্ক্রিপশন নেওয়াও সেই সুবাদে। কলামন্দিরে এল আমার জীবনে আজ অবধি শোনা অঞ্জন‌দা-র সবটুকু নিয়ে তৈরি একটা গোটা কনসার্ট - "অঞ্জনবর্ণ"। মেরী অ্যান ২, আমার কাছে সেখান থেকেই হয়ে গেল বছর শেষের এই দুটো সপ্তাহে রিপন স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট কিংবা শ্যামবাজারে বড়ুয়ার প্যান্থেরাস খেয়ে গলি গলি, তস্য গলি দিয়ে হাঁটতে থাকার গান। আসলে, শিখতে গেলে সবসময় সামনে বসতে কি হয়? আমিও কি অজান্তেই অঞ্জনদার তারুণ্যে ফিরে গিয়ে সে সময়ে কলকাতার এক ঝাঁক আন্তর্জাতিক মানুষের থেকে শিখছি না?
এখনও এমন এক‌ আশ্চর্য শহরে থাকি, যে শহরে অনেক সমস্যা পেরিয়েও এই একটা ম্যাজিক মাঝে মাঝে দেখতে পাওয়া যায়। আমরা ছুঁতে পারি আমাদের তারকাদের কারণ তারা অনেকেই তারকাসুলভ দূরত্বে থাকতে চান নি কোনদিন। তাঁরা রাস্তায় নেমে আসেন সলিল চৌধুরী, মৃণাল সেনের মত। শঙ্খ ঘোষের মত রোববার বাড়ির দরজা খোলা রাখেন এত এত কাছের মানুষদের সাথে আড্ডা দেবেন বলে। আমাদের শহর এখনও সাহস দেয় যে, এরকম মানুষদের সাথে সামনে বসে খোলাখুলি আলোচনা করা যায় তাঁদের ‌কাজ‌ নিয়ে, কাজের পেছনে ভাবনা নিয়ে, এমনকি চাইলে‌ তর্কও করা যায়। প্রশ্ন করা আর‌ প্রশ্ন করতে ‌পারার মনটাকে, বাঁচিয়ে রাখতে পারা, আর একটা নতুন কিছু বা অন্য কিছু খোঁজার চেষ্টাটাকে "সারাজীবন বইতে পারা সহজ নয়"। তবু সেটা আমাদের অস্তিত্বের জন্যই ন্যূনতম একটা প্রয়োজন। তাই শুধু নিজের বাড়ির উঠোনটুকুতে একটু অলস সময় কাটানো নয়, অঞ্জনদা এই আড্ডায় আমাদের কোন উত্তর দেন না; শুধু, প্রশ্নগুলোকে উস্কে দিতে থাকেন মডারেটর হয়ে।
আমাদের এভাবেই ঘন্টা তিনেক কেটে যায়। মনে পড়তে থাকে, এ বছর জানুয়ারিতে কতবার মোহনবংশীর সামনে দিয়ে একা একা হেঁটেছি এই ভেবে যে, যদি কখনও অতর্কিতে দেখা হয়ে যায়? সে সুযোগ তবে বছরের শেষে এভাবেও আসে আমাদের কারও কারও? হাফ চকলেটে প্রথম দেখি ছন্দাদিকে, এক চরিত্রে, কিচেন সামলাতে। আর কাল ছন্দা দি, আর তার সাথে কেউ কেউ আমাদের জন্যে পরম যত্নে দিয়ে যান একটু ফিস বল নুডল স্যুপ আর চিকেন/পর্কের রান্না। এরকম ভাল আমাদের কলকাতা? এতটা স্বপ্নের মত একেকটা ডিসেম্বরের শেষ?
এ লেখা লিখতে লিখতে আবার সেই জ্বরটা আসছে মনে হয়। গোছাতে পারছি না। কিচ্ছু গোছাতে পারছি না। এক্ষুণি, আমাকে এক বন্ধু WhatsApp-এ দুটো শব্দ লিখে দিয়েছে - বেনেপুকুরের Benedetto.
Benedetto ? The blessed one? কী বলতে চাইছে? আমাদের কথা, নাকি ওঁর? আমার জানা নেই। আপাতত, একটু হাঁটতে যাব আবার। এ কথাটা নিয়ে একটু ভাবব। আপনারাও ভাবুন না হয়। একসাথে ভাবা প্র্যাকটিস করা যাক।

23 December 2022



Comments

Popular posts from this blog

অনাদায়

  ১। যে আঁচেতে পুড়ে যাওয়া একটু একটু করে, সে আগুন তোমার তো নয় জানি। তবে? বসুধা কুটুমবাড়ি, অতএব পুড়ে যেতে হবে। কোথায় জ্বলছে পেট, কোথায় চাকরি, বাড়ি, যেদিকে তাকাই সবাই ছুট্টে আসে, জন্মপঞ্জি নিয়ে। মা বাবার পরিচয় চায়। ওরা বলে, দেখছ না? একই তো পেটের ফল। আর বল্‌, পাপ নিবি কি না? এই পাপ আমাদের একা করে কোন খাদে নিয়ে যাবে, এখনও জানি না।       ২। এমন করলে কেন? বুঝেছিলে মৃত্যু আসীন? এ প্রশ্নে একটি রক্তবাণ বিদ্ধ করে, সমস্ত দিন, সমস্ত রাত নির্ঘুম। দিনে রাতে পেয়াদার ডাক, আড়ং ধোলাই আসে আকাশকুসুমে, থাক থাক, আর মেরো না খোদাতালা, প্রভুর দাসেরে। বল সুবিনীত হবে? হব, তবে তোমার জন্যে এই টক্সিক উপোস-কানুন নেশা জানিনা কিচ্ছুটি, শেষ হবে কবে।     ৩। নিজের দূরাত্মীয়, সেই হল এখন প্রথমা। ভেবেছিলে সেটাই দায়িত্ববোধ। একবার হাত পাতলে সেই হাত ফিরে ফেরে, সেটা জানতে না বুঝি? বলেছিল তোমার আত্মজ। আসল আত্মীয় কে? অন্য কেউ? দুরাত্মা? জারজ?     ৪। এটুকু কিছুই নয়। ঢের বাকি আছে। সামাজিক অপমান , পুলিশ , আদালত , পাড়াছাড়া। র...

পাড়া ক্রিকেট

  নিয়ে আয় খেলোয়াড়ি বল, উড়ুক তুফানে উইকেট‌; আগেভাগে পিচটিচ ঠিক কর তোরা – আমার উদ্যানে। বাড়ির সামনে চেঁচা উত্তাল - "ভাই, ভাই ওটা পায়ে‌ লেগেছিল", ভেঙে ফ্যাল আমাদের নিশ্চুপ পাড়ার বিকেলঘুম, নিজের দিকেতে শাসানির চারটে আঙুল, আর বিরুদ্ধতার তর্জনী। আমাদের শীতকাল, বয়স বিরুদ্ধতা জুড়িয়ে উঠুক, জুড়িয়ে উঠুক সব বন্ধুতা বিচ্ছেদ, চাকরির অপলাপ এইচ-আর সালিশী সভা; আর জুড়িয়ে তুবড়ে দে, দে তো‌ দেখি, হিংসুটে দৈত্যের বাগানেতে অপ্রতিম কাঁটাগাছ, আর ভেতরেতে নুয়ে পড়া করুণ জবা। মধ্যবয়সে যারা বুড়ো ভাম, ভীমরতি প্রাপ্তির সামান্য দূরে – এটুকু মানতে পারি, আমাদের বাপ, মা, কাকারাই পাড়ায় পাড়ায় আদরে, বেনামে, কালো টাকা আর সবুজ উদ্যানে, ফেলেছে সিন্ডিকেট, নির্মিয়মাণ ফ্ল্যাট, ফণীমনসার কাঁটা বেড়ার স্তবক। এখন বিকেল হল। আমার পাড়াকে তোরা টেনে আন উদ্যানে। আমাদের আওয়াজের ভদ্রতা ভয়টুকু ব্যাটেতে, বলেতে নাচা- "আউট, আউট"। শেখা ঢের বাকি আছে নীতি বা সবক। ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

সুসংবাদ, এসো

সুসংবাদ আর আসেনা  আর সত্যিই আসেনা আমার এই দিনানুদিনে। অতএব, আমি তো সত্যিই এই ঝাকানাকা অতীতবিলাসটুকু ভাঙিয়ে খাই‌। আর মেয়ে পটাতে গিয়ে বলি, মাত্র পনেরোতে,  মানে তাও তো পনেরো হল, সুনীল গাঙ্গুলী আমাকে একদিন পিছলে পড়ে স্কচ খাইয়ে, নাকি কৃত্তিবাসে কবিতা ছাপিয়ে দেবে বলেছিল। হেঁ, হেঁ... কেউ কথা রাখেনি। কেউ কি রাখে? তাও তো হাফে... হাফ হাতা, শালা,  হাঁটুর বয়সে... খুশি। খুশি, মেড়ো মাল  নতুন বাংলা লিখা শিখেছে হাঁটুর বয়সে,  এই তো ইদ্রিস ওর হাঁটুর বয়সে, ব্যথা, বিয়ে হবে ওদের।  প্রজাপত্য। আর লেখা ছাপা হবে আনন্দ...আনন্দ, দেশ, আমাদের দেজ... এসো, সীমাহীন সুসংবাদ, এসো সুসংবাদ, এসো! ১৮ এপ্রিল,‌ ২০২৬