Skip to main content

নট ভৈরব

ভোর থেকে সকাল হওয়া আমরা তো অনেকেই দেখেছি শতদ্রু, কিন্তু তার পরে যে সকালটা জেগে ওঠে ; সেটা? আমাদের ব্যস্ততার অজুহাত দিয়ে অনেকেই রাত জাগছি আজকাল। এক একটা রাত হওয়া দেখছি ; দেখছি মানুষ কীভাবে নিজস্ব হয়ে ওঠে রাতের এক একটা পর্দার সাথে। এখন ফেসবুকে একটা কথা বেশ জনপ্রিয় হয়েছে না যে, আমাকে চিনতে হলে আমার সাথে ভোর চারটে অবধি জেগে থাকাটাও আবশ্যিক?

সে কথা অন্য কোনখানে হবে না হয় ; আজ তোমায় আমার সকালের গল্প বলি। যে কথা হচ্ছিল, এই রাত আমাদের ঘুমোতে দেয় নি বলেই আমাদের উঠতে বেজে যায় সকাল সাড়ে সাতটা, আটটা, ন'টা কিংবা তারও পরে। ভোরের কথা তো তুমি জান। ভোর কীভাবে হয়ে জন্ম দেয় এক একটা জলজ্যান্ত সকালের, কীভাবে নদীর জলের রং বদলে যায়, পাখিরা জেনে নেয় কাজের বিধিবদ্ধ রূপ আর জানিয়ে দেয় বাড়িতে বাড়িতে একা কালো কাক - এসব অনেকেই লিখেছেন। লেখা খানিক সহজও বটে। আমি তোমায় অন্য গল্প বলি।
সেই সব সকাল যখন কেজো আমি-টার জন্ম হয় নি, আমি জেগে উঠতাম এক একটা কবিতা নিয়ে, গান নিয়ে যার সাথে জুড়ে যেত গত রাতের মেয়েটির হাসির আওয়াজ, কথা বলার নিবিড় গন্ধ, দু'জনের মেসেজ লিখতে লিখতে পড়তে পড়তে স্মিত হাসির স্নিগ্ধতা...'পৃথিবীর যত প্রেম আমাদের দু'জনের মনে'। আর তাই সকাল সাড়ে সাতটায় উঠে সারা বছরই আমার মনে হত শরীরে বসন্তের ধুলোক্লান্তি ভার ছাড়াও আগাম বৃষ্টির গন্ধ লেগে আছে। আমি খুব সতেজ জেগে উঠতাম জানো, খুব সতেজ। আমার বারান্দায় যে ঘৃতকুমারী গাছ, দেখে নিতাম সে এখনও ভিজে আছে কিনা। তার সব ডাল-পাতা সবুজ আছে তো? হয় তো কিছু পাতা কাল বেশি সবুজ ছিল, আজ সে গাঢ় আর অন্যটি সেই সদ্য তেরো বছরের কিশোরীর নিঃশ্বাসের মত পেলব। রোদের জন্ম হয়েছে এই ঘন্টা খানেক হ'ল। আটটা বেজেছে ঘড়ির কাঁটায়।
আমি চা নিয়ে বসে এসব কত কী ভাবতে থাকি, শতদ্রু। সকাল যত বাড়ে রোদের গন্ধটা কীভাবে বদলে যায় দেখেছ? আচ্ছা, আমি তোমায় আরও ভালো করে বলতে পারি। এই সকালের বদলটা একটু রাগসঙ্গীতে বেশি ভাল বোঝা যায়। প্রত্যেক প্রহরের নিজস্ব রাগ আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি যেটা দরকারী সেই প্রহরের অনুভবটা রাগের বিলম্বিত থেকে দ্রুতে আসতে আসতে কীভাবে এসে পড়ছে সেটা জানা। আমি ২ ঘন্টা - ৩ ঘন্টা গাইব নট ভৈরব। তাহলে যদি তোমায় কিছুটা বোঝাতে পারি। তুমি যখন সাড়ে সাতটায় ঘুম থেকে উঠেছ তখন আমি নট ভায়রোর পঞ্চমে (পা) এ দাঁড়িয়ে। আমার বিলম্বিতের প্রসার আড়মোড়া ভেঙেছে। তুমি ওঠো দেখ আমি কীভাবে রে, গা, মা, পা থেকে আবার রে-তে ফিরে আসছি, ফিরে আসছি ন্যাস স্বরে। বিলম্বিতে প্রত্যেক সুর আমার আদরের। আমি কিন্তু আর ভোরের আলোয় নেই। তাই মন্দ্র সপ্তকের কোমল ধা-র স্পর্শ, ভৈরবের মায়া ছেড়ে দাড়িয়েছি নট অঙ্গে। যা বলতে চাইছিলাম - বিলম্বিতে প্রত্যেক সুরের আদরে আমি নেমে আসছি সকালের আলস্যে, সকালের চমৎকারে। তাই যখন আমি পঞ্চম ছুঁয়ে দিই তখন সকালের প্রত্যেকটা রোদের কণা আমার ত্বকে শিশিরের মত এসে স্থাণু। পঞ্চম আমার বিলম্বিত গানের অপার স্থিতি। প্রত্যেকটা সুরে আমি দাঁড়াই গভীর হয়ে, আর সব কিছুই গভীর ভাবে দেখি।
আমি ঝকঝকে একটা দিনের অপেক্ষায়। এর পর যখন আটটা বেজে পনেরো মিনিট তখন অনেকেই বাজার সেরে ফিরছেন, বাড়ির পাশে হেঁকে যাচ্ছেন ফল বিক্রেতা, আর কেউ কেউ কাজে বেরোনোর প্রস্তুতি শুরু করছেন ; কেউ কেউ বেড়িয়ে পড়েছেন। আমি তাদের সমস্ত উদ্দ্যম নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি তার সপ্তকের উদাত্ত ষড়জে (সা)। আমার সামনে ভেসে যাচ্ছে আলোর স্রোত, নতুন ভাবে বেঁচে ওঠা একটা আলোক-নদী আর ঝর্ণার স্নানের আওয়াজ। সকাল ন'টার আগে আমি তার সপ্তক ছেড়ে যেতে পারব না, জানি। আমি সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেব এই সকালের তেজস্‌ - বেড়িয়ে পড়। আরও একটা দিন। দেখে নাও, কীভাবে গাড়ির ঝাঁক আমাদের নিয়ে চলে অলক্ষ্যের দিকে। রোদের বন্যায় কীভাবে ভেসে যাচ্ছে আকাশী কলকাতা।
তার পর যখন আসতে আসতে তোমরা অফিসে ঢুকেছ, শুরু হবে আমার দ্রুত খেয়াল। কাজের আবহ, গতি, সমস্ত ঢেলে দেব আমি শতদ্রু। আর কি ক্লান্ত লাগে? আর কি মনে হয় আলস্য এসে পড়ুক? তাই চটজলদি একেকটা সুর গড়িয়ে পড়ে অন্য সুরের গলায়। একেকটা কাজ বুঝে নেওয়ার আগেই,অন্য কিছু অপেক্ষমান। আমি গেয়ে চলছি দ্রুত তান। আমার সাবলীল গতি তিন সপ্তকের সমস্ত সুরে। আমি ছড়িয়ে দিচ্ছি গতির বিচ্ছুরণ...
আর চারদিকে দেখছি শুধু আলো...আলো...আর আলো...
২০ ফেব্রুয়ারী , ২০১৭

Comments

Popular posts from this blog

অনাদায়

  ১। যে আঁচেতে পুড়ে যাওয়া একটু একটু করে, সে আগুন তোমার তো নয় জানি। তবে? বসুধা কুটুমবাড়ি, অতএব পুড়ে যেতে হবে। কোথায় জ্বলছে পেট, কোথায় চাকরি, বাড়ি, যেদিকে তাকাই সবাই ছুট্টে আসে, জন্মপঞ্জি নিয়ে। মা বাবার পরিচয় চায়। ওরা বলে, দেখছ না? একই তো পেটের ফল। আর বল্‌, পাপ নিবি কি না? এই পাপ আমাদের একা করে কোন খাদে নিয়ে যাবে, এখনও জানি না।       ২। এমন করলে কেন? বুঝেছিলে মৃত্যু আসীন? এ প্রশ্নে একটি রক্তবাণ বিদ্ধ করে, সমস্ত দিন, সমস্ত রাত নির্ঘুম। দিনে রাতে পেয়াদার ডাক, আড়ং ধোলাই আসে আকাশকুসুমে, থাক থাক, আর মেরো না খোদাতালা, প্রভুর দাসেরে। বল সুবিনীত হবে? হব, তবে তোমার জন্যে এই টক্সিক উপোস-কানুন নেশা জানিনা কিচ্ছুটি, শেষ হবে কবে।     ৩। নিজের দূরাত্মীয়, সেই হল এখন প্রথমা। ভেবেছিলে সেটাই দায়িত্ববোধ। একবার হাত পাতলে সেই হাত ফিরে ফেরে, সেটা জানতে না বুঝি? বলেছিল তোমার আত্মজ। আসল আত্মীয় কে? অন্য কেউ? দুরাত্মা? জারজ?     ৪। এটুকু কিছুই নয়। ঢের বাকি আছে। সামাজিক অপমান , পুলিশ , আদালত , পাড়াছাড়া। র...

পাড়া ক্রিকেট

  নিয়ে আয় খেলোয়াড়ি বল, উড়ুক তুফানে উইকেট‌; আগেভাগে পিচটিচ ঠিক কর তোরা – আমার উদ্যানে। বাড়ির সামনে চেঁচা উত্তাল - "ভাই, ভাই ওটা পায়ে‌ লেগেছিল", ভেঙে ফ্যাল আমাদের নিশ্চুপ পাড়ার বিকেলঘুম, নিজের দিকেতে শাসানির চারটে আঙুল, আর বিরুদ্ধতার তর্জনী। আমাদের শীতকাল, বয়স বিরুদ্ধতা জুড়িয়ে উঠুক, জুড়িয়ে উঠুক সব বন্ধুতা বিচ্ছেদ, চাকরির অপলাপ এইচ-আর সালিশী সভা; আর জুড়িয়ে তুবড়ে দে, দে তো‌ দেখি, হিংসুটে দৈত্যের বাগানেতে অপ্রতিম কাঁটাগাছ, আর ভেতরেতে নুয়ে পড়া করুণ জবা। মধ্যবয়সে যারা বুড়ো ভাম, ভীমরতি প্রাপ্তির সামান্য দূরে – এটুকু মানতে পারি, আমাদের বাপ, মা, কাকারাই পাড়ায় পাড়ায় আদরে, বেনামে, কালো টাকা আর সবুজ উদ্যানে, ফেলেছে সিন্ডিকেট, নির্মিয়মাণ ফ্ল্যাট, ফণীমনসার কাঁটা বেড়ার স্তবক। এখন বিকেল হল। আমার পাড়াকে তোরা টেনে আন উদ্যানে। আমাদের আওয়াজের ভদ্রতা ভয়টুকু ব্যাটেতে, বলেতে নাচা- "আউট, আউট"। শেখা ঢের বাকি আছে নীতি বা সবক। ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

সুসংবাদ, এসো

সুসংবাদ আর আসেনা  আর সত্যিই আসেনা আমার এই দিনানুদিনে। অতএব, আমি তো সত্যিই এই ঝাকানাকা অতীতবিলাসটুকু ভাঙিয়ে খাই‌। আর মেয়ে পটাতে গিয়ে বলি, মাত্র পনেরোতে,  মানে তাও তো পনেরো হল, সুনীল গাঙ্গুলী আমাকে একদিন পিছলে পড়ে স্কচ খাইয়ে, নাকি কৃত্তিবাসে কবিতা ছাপিয়ে দেবে বলেছিল। হেঁ, হেঁ... কেউ কথা রাখেনি। কেউ কি রাখে? তাও তো হাফে... হাফ হাতা, শালা,  হাঁটুর বয়সে... খুশি। খুশি, মেড়ো মাল  নতুন বাংলা লিখা শিখেছে হাঁটুর বয়সে,  এই তো ইদ্রিস ওর হাঁটুর বয়সে, ব্যথা, বিয়ে হবে ওদের।  প্রজাপত্য। আর লেখা ছাপা হবে আনন্দ...আনন্দ, দেশ, আমাদের দেজ... এসো, সীমাহীন সুসংবাদ, এসো সুসংবাদ, এসো! ১৮ এপ্রিল,‌ ২০২৬