Skip to main content

বাড়ি আছ?

 তোমার সাথে ফেসবুকে যেদিন প্রথম কথা হয়েছিল,‌মনে‌ আছে, সেদিন পাটুলীর নার্সারী থেকে কিছু গাছ‌ কিনেছিলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, কী বই পড়ছ এখন। তুমি বলেছিলে, ইলিয়াসের 'চিলাকোঠার' সেপাই। তোমার সেই আঞ্চলিক উচ্চারণে বইটির নাম বদলে যাওয়া মনে আছে।

সেদিন লেক রোডে সন্ধ্যেবেলা হাঁটছি। শীত শুরু হবে হবে। বাতাস শুধু উৎসব উৎসব হয়ে আছে। নজরুল মঞ্চে রূপম ইসলাম বাংলা রকের নির্মাণ-বিনির্মাণ করে চলেছেন। রাক্ষসবাদ্য গিলে নিচ্ছে লেকের নিবিড় দুটো ছেলেময়ের হাতের অপরাহ্নতা, ঠোঁটের চুমুকের শব্দ-গন্ধ।‌ এ পাড়ায় সন্ধ্যে হলে‌, এখনও পাখি ফেরার আওয়াজে গাছ আর আকাশ ঝমঝম করে ওঠে। তবে, আজ শুধু রূপম গাইছেন - "ভেসে যাচ্ছি এবং,/ভিজে যাচ্ছি আবার/এক অপূর্ব অসম্ভবে/শোনো তুমি কি আমার হবে?/আজও তুমি কি আমার?"
মনে আছে।
কলেজ স্ট্রীটে‌ একদিন‌ আমরা (সত্যি নয়, মনে‌ মনে) হেঁটে‌, ঘেমে নেয়ে, ধুলোস্নানের পর‌ প্যারামাউন্টে বসেছি। তোমার অগোছালো চুল, চব্বিশে কপালে বলিরেখা সামলে তুমি অর্ডার দিতে গিয়ে জানতে চাইছ, ডাব মালাইটা হবে?
না।
এবার সামনে রাখা মেনুকার্ড মুহূর্তে সাদা হয়ে যায়। তুমি চশমা সামলে নাও। মনে হয়, বুরিদানির অভুক্ত গাধার মত দুটো সমান‌ দূরত্বে থাকা খাওয়ারের মধ্যে বেছে নিতে পারছ না‌ কোনটা মুহূর্তে পাবে, কোনটা ভাল। আমি বলি, প্যাশন ফ্রুট। বিকল্প বল, ব্যাক-আপ বল - আমার সব হাতের মুঠোয় বলেই ছোট থেকে জেনেছি। তুমি বললে, আমাকেও তাই দিন।
মনে আছে।
সব মনে আছে। কিন্তু,‌‌ তারপর হঠাৎ এক‌ একদিন কলেজ স্ট্রীটে বই কিনে‌ প্রেসিডেন্সীর সামনে হাঁটতে হাঁটতে মনে‌ হয়, বিকল্প পাচ্ছি না। সেন্ট্রাল মেট্রোয় ওঠার আগে মেডিকাল কলেজের সামনে একটা পথশিশু গাছের ডালে শাড়ি বেঁধে দিব্যি পাঁউরুটি চিবোতে চিবোতে হ্যামকানন্দে দোল খাচ্ছিল। ছবি নেব ভাবি। সংযত হই। ওকে কোন‌ বিকল্প দেব? কিছু কি দেওয়ার থাকে আমাদের? ও ভাগ্যবান! ওর হ্যামক চাই না ; বিকল্প আছে। সাঙ্গুভ্যালীতে স্পেশাল মোগলাই নিই। খেতে খেতে বইটা উল্টেপাল্টে দেখি। আর বিড়বিড় করি- বিকল্প, আছ নাকি? আমার passive cluster node? পূর্ণ সিনেমার টিকিট একটা চিরকালীন বন্ধ কাউন্টারের সামনে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ চোখের সামনে দেখতে পাই, 100% packet loss মেসেজ। Server not responding.
রাধুবাবুর দোকানের সামনে এসেছি।‌ চা সামলে ভীড় থেকে তফাতে দাঁড়াই। কান ঝনঝন করে ওঠে। শব্দ। শব্দ! ফসিলস্-এর অসহনীয় ড্রামস্ আর গীটারের অশ্লীল শীৎকার ছাপিয়ে কান‌ ভোঁ ভোঁ করে ওঠে - কই গেলে? বিকল্প? বিকল্প? বিকল...
আমি তোমাকে ছুঁতে চাইছিনা আর। সে‌সব আজন্মলালিত নিঃশ্বাস আমার স্বপ্নে থাক। তবে সকালে উঠে প্রথমে ব্যালকনি পেরিয়ে ঐ সেদিনের পাটুলীর নার্সারী থেকে গাছেদের কাছে এখনও যাই। ওদের জলখাবার দিই। ওষুধ দিই যখন যেমন লাগে। বিকল্প নেই। ওরা আছে।‌
আছে।
১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩
(ছবিতে সাঙ্গুভ্যালীর স্পেশাল মোগলাই আর সেই বই)

Comments

Popular posts from this blog

অনাদায়

  ১। যে আঁচেতে পুড়ে যাওয়া একটু একটু করে, সে আগুন তোমার তো নয় জানি। তবে? বসুধা কুটুমবাড়ি, অতএব পুড়ে যেতে হবে। কোথায় জ্বলছে পেট, কোথায় চাকরি, বাড়ি, যেদিকে তাকাই সবাই ছুট্টে আসে, জন্মপঞ্জি নিয়ে। মা বাবার পরিচয় চায়। ওরা বলে, দেখছ না? একই তো পেটের ফল। আর বল্‌, পাপ নিবি কি না? এই পাপ আমাদের একা করে কোন খাদে নিয়ে যাবে, এখনও জানি না।       ২। এমন করলে কেন? বুঝেছিলে মৃত্যু আসীন? এ প্রশ্নে একটি রক্তবাণ বিদ্ধ করে, সমস্ত দিন, সমস্ত রাত নির্ঘুম। দিনে রাতে পেয়াদার ডাক, আড়ং ধোলাই আসে আকাশকুসুমে, থাক থাক, আর মেরো না খোদাতালা, প্রভুর দাসেরে। বল সুবিনীত হবে? হব, তবে তোমার জন্যে এই টক্সিক উপোস-কানুন নেশা জানিনা কিচ্ছুটি, শেষ হবে কবে।     ৩। নিজের দূরাত্মীয়, সেই হল এখন প্রথমা। ভেবেছিলে সেটাই দায়িত্ববোধ। একবার হাত পাতলে সেই হাত ফিরে ফেরে, সেটা জানতে না বুঝি? বলেছিল তোমার আত্মজ। আসল আত্মীয় কে? অন্য কেউ? দুরাত্মা? জারজ?     ৪। এটুকু কিছুই নয়। ঢের বাকি আছে। সামাজিক অপমান , পুলিশ , আদালত , পাড়াছাড়া। র...

পাড়া ক্রিকেট

  নিয়ে আয় খেলোয়াড়ি বল, উড়ুক তুফানে উইকেট‌; আগেভাগে পিচটিচ ঠিক কর তোরা – আমার উদ্যানে। বাড়ির সামনে চেঁচা উত্তাল - "ভাই, ভাই ওটা পায়ে‌ লেগেছিল", ভেঙে ফ্যাল আমাদের নিশ্চুপ পাড়ার বিকেলঘুম, নিজের দিকেতে শাসানির চারটে আঙুল, আর বিরুদ্ধতার তর্জনী। আমাদের শীতকাল, বয়স বিরুদ্ধতা জুড়িয়ে উঠুক, জুড়িয়ে উঠুক সব বন্ধুতা বিচ্ছেদ, চাকরির অপলাপ এইচ-আর সালিশী সভা; আর জুড়িয়ে তুবড়ে দে, দে তো‌ দেখি, হিংসুটে দৈত্যের বাগানেতে অপ্রতিম কাঁটাগাছ, আর ভেতরেতে নুয়ে পড়া করুণ জবা। মধ্যবয়সে যারা বুড়ো ভাম, ভীমরতি প্রাপ্তির সামান্য দূরে – এটুকু মানতে পারি, আমাদের বাপ, মা, কাকারাই পাড়ায় পাড়ায় আদরে, বেনামে, কালো টাকা আর সবুজ উদ্যানে, ফেলেছে সিন্ডিকেট, নির্মিয়মাণ ফ্ল্যাট, ফণীমনসার কাঁটা বেড়ার স্তবক। এখন বিকেল হল। আমার পাড়াকে তোরা টেনে আন উদ্যানে। আমাদের আওয়াজের ভদ্রতা ভয়টুকু ব্যাটেতে, বলেতে নাচা- "আউট, আউট"। শেখা ঢের বাকি আছে নীতি বা সবক। ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

সুসংবাদ, এসো

সুসংবাদ আর আসেনা  আর সত্যিই আসেনা আমার এই দিনানুদিনে। অতএব, আমি তো সত্যিই এই ঝাকানাকা অতীতবিলাসটুকু ভাঙিয়ে খাই‌। আর মেয়ে পটাতে গিয়ে বলি, মাত্র পনেরোতে,  মানে তাও তো পনেরো হল, সুনীল গাঙ্গুলী আমাকে একদিন পিছলে পড়ে স্কচ খাইয়ে, নাকি কৃত্তিবাসে কবিতা ছাপিয়ে দেবে বলেছিল। হেঁ, হেঁ... কেউ কথা রাখেনি। কেউ কি রাখে? তাও তো হাফে... হাফ হাতা, শালা,  হাঁটুর বয়সে... খুশি। খুশি, মেড়ো মাল  নতুন বাংলা লিখা শিখেছে হাঁটুর বয়সে,  এই তো ইদ্রিস ওর হাঁটুর বয়সে, ব্যথা, বিয়ে হবে ওদের।  প্রজাপত্য। আর লেখা ছাপা হবে আনন্দ...আনন্দ, দেশ, আমাদের দেজ... এসো, সীমাহীন সুসংবাদ, এসো সুসংবাদ, এসো! ১৮ এপ্রিল,‌ ২০২৬