Skip to main content

রিভলভার রহস্য - আদৌ গোয়েন্দা গল্প?

 প্রথমেই কোন রাখঢাক না রেখে বলি, "রিভলভার রহস্য" একটি ভালো বাংলা সিনেমা। ডিটেকটিভ গল্পের কথা না বলে প্রথমেই বাংলা সিনেমার কথা কেন বলছি? কারণ, শুধু হিন্দী-আধিপত্যবাদের জন্য নয় বরং খুব খারাপ লাগলেও একথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে, আমরা শুধু আন্তর্জাতিকতা হারাচ্ছি না, খুব সাধারণেতর সাধারণ বলিউড বা দক্ষিণী সিনেমার কাছেও বিষয় হোক, নির্মাণশৈলী হোক বা বহিরঙ্গের চাকচিক্যে হোক - বাংলা সিনেমা কিছুতেই ধোপে টিকতে পারছে না। আমাদের সিনেমা লোকে দেখছেনা কেন, এই বিষয়ে Independent Bengalকে দেওয়া সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে একথা অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় তুলে এনেছেন যে, অন্য ভাষার সিনেমা শুধু পয়সার জোরে জিতছে কিনা একথা ভাবার আগে আমাদের নিজেদের একটা আত্মসমীক্ষণ খুব প্রয়োজন। এরকম একটা সময়ে দাঁড়িয়ে অঞ্জন দত্তের "রিভলভার রহস্য"-র মত একটা সিনেমার খুব দরকার ছিল, যা শুধু মেধায় নয় বরং নতুন একটা বাংলা রহস্যগল্প ভিত্তিক সিনেমার ভাষা তৈরী করবে।

এবার সিনেমার প্রসঙ্গে আসি। সিনেমাতে তিনটি আলাদা আলাদা জায়গার কথা উঠে এসেছে - কলকাতা, বারাসাত এবং দার্জিলিং। দার্জিলিং যে অঞ্জন দত্তের ছবিতে শুধু মাত্র একটা locale নয় বরং একটা চরিত্র, এটা নতুন করে বলার প্রয়োজন হয় না। একটা স্যাঁতস্যাঁতে দার্জিলিং, যেখানে সবসময় প্রত্যেকটা মুহূর্তই সংবেদনশীল, মারাত্মক স্পর্শকাতর এবং vulnerable তা প্রত্যেক মুহূর্তে শহরের চরিত্রায়ণে ও ক্যামেরায় লেপ্টে আছে। দার্জিলিং ছাড়া এই গল্প হত না; কেন, সেটা সিনেমা দেখলে বোঝা যাবে। আমাকে এই সিনেমার প্রথম যেটা ভাবিয়েছে সেটা হচ্ছে, এই তিনটি শহরের নিজস্ব চরিত্র, লোকেদের মুখের আদল, প্রতিদিনের ছোট ছোট মুহূর্ত অঞ্জন দত্ত কী আশ্চর্যভাবে গল্পের narrative -এর গায়েই আটকে দিয়েছেন। সিনেমাতে যখন যে শহর দেখানো হয়, সেটা সামান্য আঁচড়েই পরিষ্কার হতে থাকে, ঠিক ওঁর গানের মত। এভাবেই কলকাতার গলি, ছোটা ব্রিস্টল, চায়ের দোকান, বর্ধমানের মফস্বলের মানুষের চোখে সারল্য কিংবা রাতারাতি বড়লোক হয়ে যাওয়া মানুষের চোখে লোভের চিকচিক, একটা ভেজা দার্জিলিংয়ে মানুষের জামাকাপড় মেলা (এটা এই শহরের মানুষদের নিজস্ব struggle) থেকে শুরু করে আমাদের পরিচিত কুঙ্গা, অক্সফোর্ড বুকস্টোর, এঁদো গলি কিংবা রাস্তা বদলের সিঁড়ি - কিছুই অঞ্জন দত্ত বাদ দেন না। একটা ক্ষয়ে যাওয়া, ভেঙেচুরে যাওয়া শহর ও তার মানুষকে, পথঘাটকে তার সমস্তটা দিয়ে নির্মাণ করেন অঞ্জন দত্ত।
আমার কাছে "রিভলভার রহস্য" তাই নিছক একটা গোয়েন্দা গল্প বলে মনে হয়না বরং এই সিনেমার পরতে পরতে একটা অনেকদিন আগে পড়া কিন্তু ভুলে যাওয়া আপ্তবাক্য জড়িয়ে যায় - "মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ।" একথা কি আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সত্যিই আমরা কেউ বিশ্বাস করি? জানি না। তবে, মাঝে মাঝে আমাদের' মূর্খ বড় অথচ সামাজিক' হয়ে বেঁচে থাকতে গেলে, একথা না বিশ্বাস করে উপায় থাকে না। "রিভলভার রহস্য" আমার কাছে একটা লজ্ঝরে, পয়সাসর্বস্ব সময়ের চরম বিপণ্ণতায় দাঁড়িয়ে একটা আদ্যোপান্ত মূল্যবোধের গল্প। কিন্তু, বরাবরের মতই এই পুরো ব্যাপারটাই অঞ্জন দত্ত এত সিরিয়াস ভাবে বলেন না। বরং, মজা করে জান। স্রেফ আমাদের বাজিয়ে নিতে থাকেন। এই আপাত তরল, কিন্তু জটিল ন্যারেটিভটা অঞ্জন দত্ত সময় নিয়ে বানিয়েছেন গত দেড় বছরে। উনসত্তর পেরোনো নির্দেশকের পরিশ্রমের সম্পূর্ণ ছাপ শুধু বইয়ে নয় বরং এবার সিনেমাতে অনেক বেশি ধরা পড়ছে। বলা ভালো, অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন এবং পরিণত ভাবে এসেছে। একটা ছদ্মতারল্যের পেছনে লুকিয়ে ড্যানির ভূত বারবার শুধু সুব্রত শর্মার gurdian angel-র মত তার অবচেতনেই বারবার তার কাছে ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছা সত্ত্বেও বারবার শুধু ফিরে আসে তা নয়, বরং আমাদের কাছেও একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে থাকে - সহজে বিশ্বাস করছ কি খুব? আবার ভাব। কিন্তু, এটাও বুঝতে শেখ, যে বিশ্বাসের চেয়ে বড় কিছু আর হতে পারে না। সুব্রত শর্মাকেও তাই শেষ অবধি তার মুখোমুখি হতে না চাওয়া সত্যকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার পরেও একটু চোখ ভিজে গেলে ডেকে নিতে হয় তার বিশ্বাসের "পুরনো কাঁধকে"- "স্যার , ও স্যার , আপনি কি চলে গেছেন?" একটা panic attack-এর ভরসা হয়ে ওঠে একা রাতের আকাশের পুরনো চাঁদ। গান বেজে ওঠে। কী অসামান্য ভাবে এই গান "রিভলভার রহস্য"-তে চলে আসে! কিন্তু তা কোন sequence -এ আসে, সেটা একটা বড় স্ক্রিনে এই সিনেমা না দেখলে বোঝা অসম্ভব।
"রিভলভার রহস্য" অঞ্জন দত্তের সেরা কাজগুলোর মধ্যে হয়তো আমি রাখব না, কিন্তু একথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে, এটি এখন অবধি অঞ্জন দত্তের সেরা গোয়েন্দা গল্প-আশ্রিত সিনেমা। আমি ব্যোমকেশের কথা মাথায় রেখেই একথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি। অভিনয়ে প্রত্যেকে অনবদ্য। একজন পরিণত পরিচালক সামান্য অভিনেতাকে দিয়েও তার সেরা কাজ করিয়ে নিতে পারেন। এই সিনেমার বেশিরভাগ অভিনেতার কাজ আমাদের আগে দেখা এবং তাদের চরিত্র নির্মাণের সাথে, একটা চরিত্রকে যে তাঁরা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারেন, তার সাথে আমরা পরিচিত। এই নিয়ে তাই খুব বেশি কিছু বলছিনা। সিনেমার প্রথম চল্লিশ মিনিট কিছুটা আস্তে আস্তে তৈরী হয়। কিন্তু সিনেমার কয়েকটা গাঁথুনির ওপর যত্ন নিতে গিয়ে এই slow build-up যে সচেতন ভাবেই করা সেটা খানিকটা পরে বলতে থাকেন অঞ্জন দত্ত। যে সূত্রগুলো প্রথমে আপাত দুর্বল মনে হয়, তার দু-একটা বাদ দিয়ে প্রায় বেশিরভাগই একদম গুছিয়ে আনেন, প্রয়োজনীয় করে তোলেন দ্বিতীয় ভাগে। শুধু তাই নয়, এই সিনেমার গল্পের গতি কমে যাওয়া নিয়ে, নিজেকে নিয়েই মজা করতেও বাদ দেন না। অর্থাৎ, যে কথা দিয়ে শুরু করছিলাম, নিজের নির্মাণের দিকেই আঙুল তোলে এই সিনেমা। গল্পটা ঠিকমত বলা হচ্ছে তো?
হ্যাঁ, বলা হয়। ক্লাইম্যাক্সে প্রত্যেক মুহূর্তে তাই দর্শকদের সাথে সত্যের আর ঔচিত্যের সংজ্ঞা নিয়ে লোফালুফি খেলতে থাকে এই সিনেমার গল্প। এমনকি "রিভলভার" শব্দটারও একটা দ্বিস্তরীয় অর্থের ব্যবহার গল্পে খুব স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে। "রিভলভার রহস্য"-র making -এ এই বুদ্ধির ছাপ পরিষ্কার। সেটা কখনো কাজে দেয়, কখনো বা আরোপিত বা অতিনাটকীয় মনে হয়। কিন্তু এই প্রসঙ্গে আমার যাদবপুরের এক পরিচিত নাট্যসমালোচক অধ্যাপকের কথা বার বার মনে পড়ে, যিনি আমাদের PG তে একটা খুব জরুরী বিষয় শিখিয়েছিলেন - জীবনে যেটা ঠিক যেভাবে যেভাবে ঘটে, সেটাই বলতে থাকলে আসলে শিল্প হয় না। শিল্পকে একধাপ এগোতে বা পিছোতে হয় যাতে দর্শক বা পাঠক ভাবে - এটা তো আমার জানা, কিন্তু আমি এভাবে বলতে পারছি না বা দেখতে পারছি না কেন? সিনেমার শেষ তিরিশ মিনিট টানটান উত্তেজনায় সেই মজা করতে করতে, আসল সত্যিটা কী - সেই নিয়ে দর্শকদের অনুমানের সাথে লোফালুফি খেলতে খেলতে অঞ্জন দত্ত এই ম্যাজিকটাই দেখান।
সিনেমা শেষ হয়। আমি ভাবি অঞ্জনদার সাথে এবার ছবি তুলব না আর। পরের বার দেখা হলে জিজ্ঞেস করব - "আপনি সিনেমা বানান?" অঞ্জনদা সুব্রত শর্মাকে নকল করে বলে উঠতে পারেন হয়তো - "আজ্ঞে না, ম্যাজিক দেখাই।"

3 February, 2023

Comments

Popular posts from this blog

অনাদায়

  ১। যে আঁচেতে পুড়ে যাওয়া একটু একটু করে, সে আগুন তোমার তো নয় জানি। তবে? বসুধা কুটুমবাড়ি, অতএব পুড়ে যেতে হবে। কোথায় জ্বলছে পেট, কোথায় চাকরি, বাড়ি, যেদিকে তাকাই সবাই ছুট্টে আসে, জন্মপঞ্জি নিয়ে। মা বাবার পরিচয় চায়। ওরা বলে, দেখছ না? একই তো পেটের ফল। আর বল্‌, পাপ নিবি কি না? এই পাপ আমাদের একা করে কোন খাদে নিয়ে যাবে, এখনও জানি না।       ২। এমন করলে কেন? বুঝেছিলে মৃত্যু আসীন? এ প্রশ্নে একটি রক্তবাণ বিদ্ধ করে, সমস্ত দিন, সমস্ত রাত নির্ঘুম। দিনে রাতে পেয়াদার ডাক, আড়ং ধোলাই আসে আকাশকুসুমে, থাক থাক, আর মেরো না খোদাতালা, প্রভুর দাসেরে। বল সুবিনীত হবে? হব, তবে তোমার জন্যে এই টক্সিক উপোস-কানুন নেশা জানিনা কিচ্ছুটি, শেষ হবে কবে।     ৩। নিজের দূরাত্মীয়, সেই হল এখন প্রথমা। ভেবেছিলে সেটাই দায়িত্ববোধ। একবার হাত পাতলে সেই হাত ফিরে ফেরে, সেটা জানতে না বুঝি? বলেছিল তোমার আত্মজ। আসল আত্মীয় কে? অন্য কেউ? দুরাত্মা? জারজ?     ৪। এটুকু কিছুই নয়। ঢের বাকি আছে। সামাজিক অপমান , পুলিশ , আদালত , পাড়াছাড়া। র...

পাড়া ক্রিকেট

  নিয়ে আয় খেলোয়াড়ি বল, উড়ুক তুফানে উইকেট‌; আগেভাগে পিচটিচ ঠিক কর তোরা – আমার উদ্যানে। বাড়ির সামনে চেঁচা উত্তাল - "ভাই, ভাই ওটা পায়ে‌ লেগেছিল", ভেঙে ফ্যাল আমাদের নিশ্চুপ পাড়ার বিকেলঘুম, নিজের দিকেতে শাসানির চারটে আঙুল, আর বিরুদ্ধতার তর্জনী। আমাদের শীতকাল, বয়স বিরুদ্ধতা জুড়িয়ে উঠুক, জুড়িয়ে উঠুক সব বন্ধুতা বিচ্ছেদ, চাকরির অপলাপ এইচ-আর সালিশী সভা; আর জুড়িয়ে তুবড়ে দে, দে তো‌ দেখি, হিংসুটে দৈত্যের বাগানেতে অপ্রতিম কাঁটাগাছ, আর ভেতরেতে নুয়ে পড়া করুণ জবা। মধ্যবয়সে যারা বুড়ো ভাম, ভীমরতি প্রাপ্তির সামান্য দূরে – এটুকু মানতে পারি, আমাদের বাপ, মা, কাকারাই পাড়ায় পাড়ায় আদরে, বেনামে, কালো টাকা আর সবুজ উদ্যানে, ফেলেছে সিন্ডিকেট, নির্মিয়মাণ ফ্ল্যাট, ফণীমনসার কাঁটা বেড়ার স্তবক। এখন বিকেল হল। আমার পাড়াকে তোরা টেনে আন উদ্যানে। আমাদের আওয়াজের ভদ্রতা ভয়টুকু ব্যাটেতে, বলেতে নাচা- "আউট, আউট"। শেখা ঢের বাকি আছে নীতি বা সবক। ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

সুসংবাদ, এসো

সুসংবাদ আর আসেনা  আর সত্যিই আসেনা আমার এই দিনানুদিনে। অতএব, আমি তো সত্যিই এই ঝাকানাকা অতীতবিলাসটুকু ভাঙিয়ে খাই‌। আর মেয়ে পটাতে গিয়ে বলি, মাত্র পনেরোতে,  মানে তাও তো পনেরো হল, সুনীল গাঙ্গুলী আমাকে একদিন পিছলে পড়ে স্কচ খাইয়ে, নাকি কৃত্তিবাসে কবিতা ছাপিয়ে দেবে বলেছিল। হেঁ, হেঁ... কেউ কথা রাখেনি। কেউ কি রাখে? তাও তো হাফে... হাফ হাতা, শালা,  হাঁটুর বয়সে... খুশি। খুশি, মেড়ো মাল  নতুন বাংলা লিখা শিখেছে হাঁটুর বয়সে,  এই তো ইদ্রিস ওর হাঁটুর বয়সে, ব্যথা, বিয়ে হবে ওদের।  প্রজাপত্য। আর লেখা ছাপা হবে আনন্দ...আনন্দ, দেশ, আমাদের দেজ... এসো, সীমাহীন সুসংবাদ, এসো সুসংবাদ, এসো! ১৮ এপ্রিল,‌ ২০২৬