Skip to main content

কাবুলিওয়ালা : কসবা 'ক্রমাগত'-র নাট্যায়নের একটি বিশ্লেষণ

 রবীন্দ্রনাথ নাটক লিখেছেন। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, গান, প্রবন্ধ- এসব তো লিখেছেনই। পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথের গল্প থেকে বা উপন্যাস থেকে নাটক বা সিনেমা কি হয়নি? হ্যাঁ, তাও হয়েছে। ঢের হয়েছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের যে কোন কাজ একটা মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে নিয়ে যেতে গেলে মুশকিল যেটা হয় সেটা হচ্ছে, প্রত্যেক মাধ্যমের নিজস্ব কিছু চাহিদা থাকে। ছোটগল্প যে আঙ্গিকে বলা হয়ে থাকে, একটা উপন্যাস কিংবা আখ্যানধর্মী কবিতায় গল্প বলা হলেও ঠিক সে ধাঁচে বলা হয় না। "কথা ও কাহিনী"-র কবিতাগুলি পড়ুন।‌ গল্পই তো। সেসব গল্প থেকে একটা উপন্যাস হতে পারে, ছোটগল্পও।

প্রশ্ন উঠবে, তাতে কী হয়েছে? তাতে প্রথম সমস্যা হচ্ছে এই যে, একজন লেখক, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের মত কেউ, যখন অন্যান্য সমস্ত আঙ্গিকেই সফলভাবে সাহিত্যচর্চা করে ফেলেন, তখন তাঁর একটা ছোট গল্প থেকে নাটক বানাতে গেলে একটা যাথার্থ্যের প্রশ্ন চলে আসে। সোজা করে বলতে গেলে, কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন রবীন্দ্রনাথ তো এটাকে নাটক হিসেবে ভাবেননি, বরং ছোটগল্প হিসেবে লিখেছেন। তাঁর নিশ্চয়ই কিছু যুক্তি ছিল? সেই যুক্তির বেড়াজাল টপকে একটা ছোটগল্পকে নাটক বা সিনেমা বানাতে গিয়ে আদৌ নাটক এবং ছোটগল্পের,‌দুইয়েরই নিজস্ব চাহিদাগুলোর সাথে সুবিচার হচ্ছে তো?
দ্বিতীয়তঃ, আমার মত একুশ শতকে জন্মানো প্রাচীনপন্থীদের মনে হতে পারে, রবীন্দ্র-আঙ্গিক কতখানি রাখা গেল এই নতুন মোড়কে? রবীন্দ্রনাথ নিজে যদি একে নাটক হিসেবে মঞ্চস্থ করতেন, কীভাবে করতেন? প্রত্যেক শিল্পীর স্বাধীনতা স্বীকার করা সত্ত্বেও এই প্রশ্ন ফিরে ফিরে আসে যে, মূলধারার স্রোতটির সাথে এর সাদৃশ্য আদৌ আছে, নাকি এটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি নাটক যার সাথে রবীন্দ্রনাথের নাম জড়িয়ে থাকা ঠিক হবে না? আর সে যদি কাবুলিওয়ালার মতো কিংবা পোস্টমাস্টারের মত বহুপঠিত একটা গল্প হয়, তাহলে এই নিজস্ব পঠনের অনায্য দাবিটা আরও গাঢ় হতে থাকে।
কাবুলিওয়ালা আমার প্রথম পড়া ১৪ বছর বয়সে। তারপরে দীর্ঘ ব্যবধান। কাজের সূত্রে(ব্রিটিশ কাউন্সিলের একটি ক্রিয়েটিভ রাইটিং ক্লাসের জন্য) ৩০শে পা দিয়ে গল্পটিকে আবার কাটাছেঁড়া করতে হয়, তাও আবার ইংরেজি ভাষায়। সে অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর নয়। দীর্ঘ সময় ধরে অর্থাৎ ১৩ থেকে ৩০- গল্পটা আমার মধ্যে বেড়ে উঠতে থাকে। তেরো বছর বয়সে যে বিষয়গুলো চোখে এড়িয়ে গিয়েছিল, সেটা তিরিশে অনেকটাই কমে আসে। গল্পটা অন্যভাবে ভালো রাখতে শুরু করে। এ প্রসঙ্গে বলা ভাল যে, কাবুলিওয়ালা গল্পটি প্রকাশের সময় রবীন্দ্রনাথের নিজের বয়স ছিল আঠাশ। এখানে আরেকবার বুঝি যে, আমাদের বয়স কেন আমাদের অভিজ্ঞতা বা সৃষ্টির ধারের মাপকাঠি হতে পারে না।
এই সমস্ত কথা মাথায় রেখেই বলতে হচ্ছে যে, কসবা ক্রমাগতর মঞ্চস্থ করা কাবুলিওয়ালা, আমার মতে রবীন্দ্র-ঘরানার নাটকের একটা যথার্থ প্রয়োগ। নাট্যকার ও নির্দেশক গৌতম ভট্টাচার্য পুরো গল্পটাকেই আজকের মঞ্চে এমন ভাবে নিয়ে আসছেন যে, প্রত্যেক চরিত্রকে রবীন্দ্রনাথের নিজের হাতে বানানো চরিত্র ভাবতে অস্বস্তি হচ্ছে না। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের চরিত্রেরা যেভাবে চলাফেরা করেন তাদের শরীরী ভাষায়, তাদের মঞ্চের ভাষায়, সেটা নির্দেশক অত্যন্ত যত্ন নিয়ে খেয়াল রেখেছেন। সম্পূর্ণ নাটকে তাই রবীন্দ্রসুরের কোনো রকম বিচ্যুতি হয় না, বরং কাবুলিওয়ালা একটি রবীন্দ্রনাথের গল্পের বিশ্বাসযোগ্য মঞ্চায়ন হয়ে ওঠে। এটা করতে গিয়ে যেমন মঞ্চ-নির্মাণ এবং মঞ্চের মাঝে একটি অদৃশ্য রেখার মাধ্যমে ঘরে ও বাইরেকে নির্দেশক মঞ্চের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন, তেমনই নাটকের পোশাক এবং মেকআপ চরিত্রগুলিকে পরিছন্ন ও মঞ্চ-উপযোগী করে তোলে।
যে কোন নাটকেরই শিরদাঁড়া হচ্ছে তার নির্দেশক এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো হচ্ছেন অভিনেতারা। নির্দেশনার কথা বলেছি, এবার অভিনয়ের কথায় আসি। কাবুলিওয়ালার চরিত্রে নামভূমিকায় অংশুমান চক্রবর্তী অনবদ্য। চরিত্রটি নিজেই বিস্তৃত বলে নয়, বরং এত বড় একটি চরিত্রকে প্রত্যেক মুহূর্তে সজীব ও জ্যান্ত করে তুলতে তাঁর যে পরিশ্রম তাকে কুর্নিশ। মিনির ক্ষেত্রেও তাই। মিনি চরিত্রটির অভিনয়ে এক দশ বছরের শিশুর স্ফুরণ এবং বেদন একসাথে অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে এসেছে। চরিত্রের এবং যুগের প্রয়োজনেই এই নাটকে মিনির বয়স মূল গল্পের মত পাঁচ নয়, বরং দশ। অতএব সেই বিষয়টিও নির্দেশক মাথায় রেখেছেন যে, আজকের মিনিকে পনেরো বছরে বিয়ে দেওয়া সংগত নয়। তাই কাবুলিওয়ালা রহমত দশ বছর পর ছাড়া পেয়ে যখন জানতে পারে যে, মিনি 'সসুর বাড়ি যাবে' তখন মিনির বয়স এই নাটকে কুড়ি। কোন নাটকের মূল চরিত্ররা উজ্জ্বল আর পার্শ্বরচরিত্রেরা দুর্বল হলে পুরো নাটকটিকেই বিসদৃশ লাগে। সেই সমস্যা থেকেও এই নাটক মুক্ত : অভিনয় প্রত্যেকেরই এক তানে, এক তারে বাঁধা।
এই নাটকে আরেকটি সংযোজন দুটি রবীন্দ্রগানের নৃত্যায়ন। নাট্যদলের সদস্যরা যখন একটি বৃহত্তর পরিবার হয়ে ওঠেন তখন তাদেরও নাটকের কিছু ভূমিকার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আর সেই পরিবারের কথা মাথায় রেখে হয়তো এই ভাবনা। কিন্তু গান দুটির ব্যবহার‌ নাটকের শরীরের সাথে যেভাবে জুড়ে যায়, তাতে তা মিনিরই নিজের জগতের একটা বাইরের রূপ। কোনভাবেই আরোপিত নয়। তবে এই নৃত্যায়নে স্বতঃস্ফূর্ততার অভাব কিছু রয়েছে। তবে তা দলের খুদে সদস্যরা আগামী মহড়াগুলিতে আরো স্বাভাবিক করে তুলবেন, তাতে আমার সন্দেহ নেই।
আরেকটি বিষয় এই যে নাটকে শব্দ প্রক্ষেপণের আওয়াজের মাত্রা সবসময় নিয়ন্ত্রিত নয় ; কখনও কখনও একটু উচ্চগ্রামে বাঁধা আর তার ফলে পরবর্তী সংলাপের প্রথম অংশ শুনতে মাঝে মাঝে একটু অস্বস্তি হয়েছে।
তবে তাতেও, রোববার সকাল থেকেছে রোববারেতেই। রবিবার, রবীন্দ্র সদন আর রবীন্দ্রনাথের গল্পের ওপর একটি নাটক। অসুস্থ সময়ে রবীন্দ্রনাথ যে সর্বজনীন পিতৃত্বের কথা বলেন এবং বারবার যেকোনো আন্তর্জাতিক বাঙালির মত দেশ‌ও জাতীয়তাবাদের গণ্ডি নিয়ে খুব একটা গুরুত্ব দেন‌ না- সে কথা আবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল আজকে সকালে এই কাবুলিওয়ালার মঞ্চায়ন। কিছু অনুভূতি সার্বজনীন। আর সেই অনুভূতির কথা ঠিক ভাবে বলতে পারলে চোখ‌ তো ভিজে আসবেই।
এই আর‌ কী!
২০ আগস্ট, ২০২৩

Comments

Popular posts from this blog

অনাদায়

  ১। যে আঁচেতে পুড়ে যাওয়া একটু একটু করে, সে আগুন তোমার তো নয় জানি। তবে? বসুধা কুটুমবাড়ি, অতএব পুড়ে যেতে হবে। কোথায় জ্বলছে পেট, কোথায় চাকরি, বাড়ি, যেদিকে তাকাই সবাই ছুট্টে আসে, জন্মপঞ্জি নিয়ে। মা বাবার পরিচয় চায়। ওরা বলে, দেখছ না? একই তো পেটের ফল। আর বল্‌, পাপ নিবি কি না? এই পাপ আমাদের একা করে কোন খাদে নিয়ে যাবে, এখনও জানি না।       ২। এমন করলে কেন? বুঝেছিলে মৃত্যু আসীন? এ প্রশ্নে একটি রক্তবাণ বিদ্ধ করে, সমস্ত দিন, সমস্ত রাত নির্ঘুম। দিনে রাতে পেয়াদার ডাক, আড়ং ধোলাই আসে আকাশকুসুমে, থাক থাক, আর মেরো না খোদাতালা, প্রভুর দাসেরে। বল সুবিনীত হবে? হব, তবে তোমার জন্যে এই টক্সিক উপোস-কানুন নেশা জানিনা কিচ্ছুটি, শেষ হবে কবে।     ৩। নিজের দূরাত্মীয়, সেই হল এখন প্রথমা। ভেবেছিলে সেটাই দায়িত্ববোধ। একবার হাত পাতলে সেই হাত ফিরে ফেরে, সেটা জানতে না বুঝি? বলেছিল তোমার আত্মজ। আসল আত্মীয় কে? অন্য কেউ? দুরাত্মা? জারজ?     ৪। এটুকু কিছুই নয়। ঢের বাকি আছে। সামাজিক অপমান , পুলিশ , আদালত , পাড়াছাড়া। র...

পাড়া ক্রিকেট

  নিয়ে আয় খেলোয়াড়ি বল, উড়ুক তুফানে উইকেট‌; আগেভাগে পিচটিচ ঠিক কর তোরা – আমার উদ্যানে। বাড়ির সামনে চেঁচা উত্তাল - "ভাই, ভাই ওটা পায়ে‌ লেগেছিল", ভেঙে ফ্যাল আমাদের নিশ্চুপ পাড়ার বিকেলঘুম, নিজের দিকেতে শাসানির চারটে আঙুল, আর বিরুদ্ধতার তর্জনী। আমাদের শীতকাল, বয়স বিরুদ্ধতা জুড়িয়ে উঠুক, জুড়িয়ে উঠুক সব বন্ধুতা বিচ্ছেদ, চাকরির অপলাপ এইচ-আর সালিশী সভা; আর জুড়িয়ে তুবড়ে দে, দে তো‌ দেখি, হিংসুটে দৈত্যের বাগানেতে অপ্রতিম কাঁটাগাছ, আর ভেতরেতে নুয়ে পড়া করুণ জবা। মধ্যবয়সে যারা বুড়ো ভাম, ভীমরতি প্রাপ্তির সামান্য দূরে – এটুকু মানতে পারি, আমাদের বাপ, মা, কাকারাই পাড়ায় পাড়ায় আদরে, বেনামে, কালো টাকা আর সবুজ উদ্যানে, ফেলেছে সিন্ডিকেট, নির্মিয়মাণ ফ্ল্যাট, ফণীমনসার কাঁটা বেড়ার স্তবক। এখন বিকেল হল। আমার পাড়াকে তোরা টেনে আন উদ্যানে। আমাদের আওয়াজের ভদ্রতা ভয়টুকু ব্যাটেতে, বলেতে নাচা- "আউট, আউট"। শেখা ঢের বাকি আছে নীতি বা সবক। ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

সুসংবাদ, এসো

সুসংবাদ আর আসেনা  আর সত্যিই আসেনা আমার এই দিনানুদিনে। অতএব, আমি তো সত্যিই এই ঝাকানাকা অতীতবিলাসটুকু ভাঙিয়ে খাই‌। আর মেয়ে পটাতে গিয়ে বলি, মাত্র পনেরোতে,  মানে তাও তো পনেরো হল, সুনীল গাঙ্গুলী আমাকে একদিন পিছলে পড়ে স্কচ খাইয়ে, নাকি কৃত্তিবাসে কবিতা ছাপিয়ে দেবে বলেছিল। হেঁ, হেঁ... কেউ কথা রাখেনি। কেউ কি রাখে? তাও তো হাফে... হাফ হাতা, শালা,  হাঁটুর বয়সে... খুশি। খুশি, মেড়ো মাল  নতুন বাংলা লিখা শিখেছে হাঁটুর বয়সে,  এই তো ইদ্রিস ওর হাঁটুর বয়সে, ব্যথা, বিয়ে হবে ওদের।  প্রজাপত্য। আর লেখা ছাপা হবে আনন্দ...আনন্দ, দেশ, আমাদের দেজ... এসো, সীমাহীন সুসংবাদ, এসো সুসংবাদ, এসো! ১৮ এপ্রিল,‌ ২০২৬