সেই পুরনো গল্পটা আবার শুরু হয়েছে। অস্কার জালি। মনোনয়ন ঠিক ভাবে হয়নি। পয়সা দিয়ে সবই কেনা যায়। খিস্তি ; পাল্টা খিস্তি ; ইত্যাদি ইত্যাদি
অথচ বুক বাজিয়ে বলতে পারি, এদের মধ্যে অধিকাংশই RRR দেখেননি। আর দেখলেও এরা মূলধারার(mainstream) ছায়াছবি বা গান কেন তৈরি হয়, কেন তার তৈরি হওয়ার প্রয়োজন এই জায়গাটাই ধরতে চাননি।নাটু নাটু শুনেছেন, কিন্তু গানটা 'কোথায়' ও 'কেন' তার (Ramkrishnite-দের ভাষায়) স্থান-কাল-পাত্রের কোন বিচার করার প্রয়োজনই মনে করেন নি। এই ছবি আজ থেকে বহু বছর আগের শ্যাম বেনেগল কিংবা নিদেনপক্ষে আশুতোষ গোয়ারিকর করলেও সান্ত্বনা পুরস্কার ভেবে ব্রডওয়েতে গিয়ে দু পাত্র মেরে আসতেন এরাই। এটাও এরা বুঝবেন না যে, অস্কার আসলে একটা mass appeal-এর কথা বলে। তার অস্তিত্বের কথা বলে। এরা ক্রিস্টোফার নোলান মন দিয়ে দেখেন না। Martin McDonagh আর Edward Berger এর শৈল্পিক ভিন্নতার জায়গাটাকেই স্বীকার করেন না। মনে হয় ,দর্শনের খুব গোড়ার কথা এদের কানের কাছে গিয়ে বলে আসি - you cannot compare apples with oranges.
একদম অন্য কথা এবার : বাংলা ভাষা 'ভালোবাসেন' এমন এক সম্পাদক তাঁর নিজের উদ্যোগে হিন্দি প্রভাব কাটিয়ে বাংলাতে শুদ্ধভাবে লিখে কীভাবে মাসে ৪০ হাজার টাকা আয় করা যায় - সে নিয়ে একটা কোর্স, তাঁর নিজের উদ্যোগে চালু করেছেন। শিক্ষক অন্য কেউ। এদিকে নিজে স্বচ্ছন্দে বাংরেজিতে লিখে যাচ্ছেন প্রতিদিন। অন্য কেউ এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে উত্তর দিচ্ছেন, "কেন, বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে?"
ঘটনা দুটো আপাতভাবে খুব বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছে কি? না। আসলে, এই দু'ধরনের মানুষই আসলে এক। সম্পাদকের একবারের জন্যও কথাটা লেখার সময় মনে হচ্ছে না যে, তিনি 'হিংলা' বলা মানুষের মতোই বলছেন, "আরে য়্যার, তু সমঝা না? ব্যস্"। এই অস্কার নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানুষগুলোর একটা সহজ সত্য মনে পড়ছে না যে, 'তুমি বিচারক নও'। বিচারক হতে গেলে যোগ্যতা লাগে।
এই দুই ধরণের মানুষই populist কাজকে সামাজিক মাধ্যমে এবং বহিরঙ্গে আজন্ম ঘৃণা করে যাবেন ,কিন্তু তারপরেই নিজের একটা 'ছকভাঙ্গা' কাজ কেন আজকেই এবং এই মুহূর্তেই জনপ্রিয় হল না (দুটোই পরস্পরবিরোধী নয় কি?) এই নিয়ে বমি করতে তাদের এক মুহূর্ত আটকাবেন না।
পেশাদারী শিল্পীরা বাণিজ্য বোঝেন। তারা গান করুক, কিছু একটা লিখুক, সিনেমা বানাক - তারা বাণিজ্য বোঝেন, এবং পৃথিবীর অধিকাংশ (quantitatively) শ্রেষ্ঠ কাজই বাণিজ্য নির্ভর। শেক্সপিয়রের সেরা কাজ তাই। ফরাসি প্রকাশনা সংস্থা Gallimard যারা বহুদিন ধরে Marcel Proust, Camus বা Antoine de Saint-Exupéry-র লেখা এবং সাম্প্রতিককালে Annie Ernaux-র লেখা বের করেছেন তারাও এই জায়গাটা ধরতে পারেন। আমি গত দু'বছর আগে একটি এডিনবার্গের একটি ক্রিয়েটিভ রাইটিং স্কুলে একটা কোর্স করি। আমাদের কোর্সের প্রথম দিন শেখানো হয়েছিল- যতক্ষণ তুমি তোমার লেখার বাজার সম্বন্ধে সচেতন নও, ততক্ষণ একটি শব্দও লিখবে না। কলকাতা লিটারেরি মিটে কিছুদিন আগে চন্দ্রিল-ও বলে গেছেন, ডেডলাইন না থাকলে উনি লিখতেই পারতেন না। বাজার বাদ দিয়ে মহৎ সাহিত্য হয় - এটা আমাদের একটা emotional fallacy. ইতিহাস মোটেই তা বলেনা আর কোনোভাবেই সাহিত্য আর তার বাজারের এই সম্পর্ক অস্বীকার করে না।
মানুষ চায় তাদের কাজ অন্যেরা দেখুক। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই জনপ্রিয়তায় বিশ্বাস করে। কিন্তু, এটা অস্বীকার করলে কীভাবে চলবে যে, একটা নতুন ধাঁচের কাজের গ্রহণযোগ্যতা শুধুমাত্র সেই কাজের নতুনত্ব বা গুণের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। নতুন কাজ করলে বাজারকে অস্বীকার করে করতে হয়। তার জন্য সমস্ত মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন। না হলেই এসব অবাঞ্ছিত বিষ ভবিতব্যের মতো বেরিয়ে আসবে।
পক্ষ নিন। মিছিলে দাঁড়াতে হবে না। নিজের সুস্থতার কসম্ - পক্ষ নিন!
১৫ মার্চ, ২০২৩
Comments
Post a Comment