[SPOILER ALERT : আমি এটা ধরে নিয়েই লিখছি যে, আপনাদের মধ্যে অনেকেই "ভুবন সোম" সিনেমাটি দেখেছেন। যারা দেখেননি, আমার অনুরোধ সিনেমাটি দেখে এই লেখার কাছে ফিরে আসুন।]
"একটা দৃশ্যে দেখি দেবদাস গাছে উঠে পেয়ারা পাড়ছে। দূর থেকে গুরুজনদের কাউকে দেখতে পেয়ে পারু চিৎকার করে ওঠে। চিৎকার মানে নিঃশব্দ চিৎকার। মজার ব্যাপারটা হল এই যে, আমরা যেখানে বসে সিনেমা দেখছি, সেখানে সেই টিনের চালের ওপর হঠাৎ প্রচণ্ড বৃষ্টি নামে। যে মুহূর্তে দেবদাস আর পারু দৌড়তে শুরু করে, ঠিক সেই মুহূর্তে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। টিনের চাল থেকে বৃষ্টির শব্দ নেমে এল আমার বুকের মধ্যে। ক্লাস সিক্স-সেভেনের একটা ছেলে সেইদিনই প্রথম জেনে গিয়েছিল, সিনেমায় সাউন্ডের impact কী, সাউন্ডের necessity কোনখানে।"
(ছবি করার আগের দিনগুলি, মৃণাল সেন, ১৯৮৭)
ভুবন সোম দেখার অনেক পরে মৃণাল সেনের এই লেখাটি পড়েছি। তবে, প্রতিবারই এরকম এক একটা লেখার সামনে দাঁড়িয়ে একটা নিজের ভাবনার পুনর্বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়। সেখান থেকেই এরপর যতবার মৃণাল সেনের কোন ছবির সামনাসামনি হয়েছি, ততবারই একজন নির্মাতা তাঁর নিজের শিল্পকে কীসের নিরিখে দেখছেন আর কোথায় কোথায় সেসবের একটা শৈল্পিক ব্যবহার করছেন - তা চোখ এড়ায় নি।
কেন বলছি? কারণ, “ভুবন সোম” নিয়ে লিখতে বসলে একটা শুরু আর শেষের বাঁধুনি ঠিক করা প্রয়োজন। মৃণাল সেনের ছবি ছক মেনে চলে না। তাই কোন লেখাতেই তাঁর কোন একটি সিনেমার আদ্যোপান্ত মূল্যায়ন সম্ভব নয় বলে আমার বিশ্বাস। কিন্তু, যে তিনটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে এই লেখার নির্মাণ তা হচ্ছে, এই সিনেমায় একটা সচেতন musical dissonance-র ব্যবহার, "অপেক্ষা"-র মোটিফের ফিরে ফিরে আসা এবং যাদুবাস্তবতা বা magicrealism-এর একটা অভাবনীয় সংযোজন।
সিনেমার শুরুতেই প্রথম দুটো বিষয় আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। ক্যামেরা জুড়ে রেললাইনের ফ্রেম আর তার সাথে কয়লা ইঞ্জিনের ঘসঘসে আওয়াজের সাথে মিশতে তাকে তবলা আর তালবাদ্য এবং কেদার রাগের আবহে সরগম। ওপেনিং ক্রেডিটের সাথে এরকম একটা musical dissonance-র ব্যবহার প্রথমেই থমকে দেয় আমাদের। কেমন একটা অসমান নয় পুরো ব্যপারটা? একটা musical nuissance নয়? প্রশ্ন আর অস্বস্তিকর অনুভবটা উস্কে যাওয়ার সাথে সাথেই আমরা দেখতে পাই ঘুষখোর টিকিট কালেক্টর যাদব প্যাটেল, রেলওয়ের উচ্চপদস্থ অফিসার ভুবন সোমের স্টেশনে আসার অপেক্ষা করছেন, কারণ ভুবন সোমের হাতেই অপেক্ষমাণ তার চাকরির ভবিষ্যৎ।
পুরো সিনেমা জুড়ে আপাতভাবে গল্প বলার ঢঙেই মৃণাল সেন এই অস্বস্তিগুলো ফিরিয়ে ফিরিয়ে আনেন একটা অন্তর্সঙ্ঘাতের গল্প বলবেন বলে। এই সংঘাতের শুরুতে আমরা দেখতে পাই যাদবের ভুবন সোমের সম্বন্ধে বিরূপ মন্তব্য আর তার উল্টোদিকে "সদা একেলে, একদম একেলে" ভুবন সোমের কাঠিন্যকে। একজন উচ্চপদাধিকারী তার শক্ত খোলসটার জন্যে, লোকে তাকে ভয়ে ভক্তি করে বলে সম্মানিত, অথচ একদম একা। এখানে যুক্ত হয় সংঘাতের দ্বিতীয় স্তর। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিচালক চরিত্র নির্মাণের একেকটা ধাপ হু হু করে উঠতে থাকেন। "সোনার বাংলা, মহান বাংলা" -র পাশাপাশি ভুবন সোম আসলে "বিচিত্র বাংলা"র একটা ছবি - এই শেষ শব্দ উচ্চারণের সাথেই সেতারের বাজনার পাশাপাশি হঠাৎ বোমার আওয়াজ শোনা যায়। এত সূক্ষ্ম অথচ মোক্ষমভাবে মৃণাল সেন মুহূর্তে আমাদের কাছে বলে দেন বাংলা ঘরে কী, আর বাইরে কী। আর সিনেমার প্রথম দশ মিনিটেই আমাদের কাছে অন্তত এটুকু পরিষ্কার হয়ে যায় কেন এই সচেতন musical dissonance-র ফিরে ফিরে আসা, কেন একটা রাগসঙ্গীতের আবহের সাথেই, রেলগাড়ির চাকার আওয়াজের, বোমার বা গুলির আওয়াজের পাশাপাশি অবধারিত সহাবস্থান। এখানে আর নতুন করে বলে বোঝাতে হয়না, যে বিজয় রাঘব রাওয়ের মিউজিক এই সিনেমার একটি স্বতন্ত্র চরিত্র।
ভুবন সোম আসলে খুঁজছেন। কিন্তু এই খোঁজা খুব সাজিয়েগুছিয়ে, ভেবেচিন্তে খোঁজা নয়। একটা চলতে চলতে খোঁজা; অবসরযাপন, পাখি শিকার করতে গিয়ে, শহুরে জীবন থেকে গ্রামে কয়েকদিন কাটাতে কাটাতে একজন বাবু-সংস্কৃতির মানুষের খোঁজা। চলতে থাকাও যে একটা খোঁজার পদ্ধতি হতে পারে সেটা তিন ধরণের যানবাহন মাধ্যমের মধ্য দিয়ে সিনেমাতে উঠে আসে- শহুরে জীবনের ব্যস্ত চলার সাথে রেলগাড়ি আর তার ক্রমাগত ঘর্ষণের আওয়াজ, তারপর শহর থেকে গ্রামীণ জীবনের transition পর্বে অপেক্ষাকৃত ধীর কিন্তু চটপটে ঘোড়ার গাড়ি আর শেষে, কিছুক্ষণ পরে, গরুর গাড়ির দৃশ্য চলে আসে যেখানে ভুবন সোম শেষ অবধি গ্রামে ঢুকে পড়েছেন। এ তার ধীর ও অখণ্ড অবসরযাপনের সময়, পাখি-শিকারের সময়। গাড়ি গ্রামের কখনও সমান, কখনও আসমান, কখনও চড়াই কখনও উৎরাই পথ দিয়ে চলতে থাকে। চালক ভুবন সোমকে মনে করিয়ে দেন, এই গাড়ি জীবনের মতই ঘাতসহ কিন্তু গতিশীল। "চলতি কা নাম গাড়ি"। আপাত সরল, মজার কথোপকথনে এখানে মৃণাল সেন লুকিয়ে লুকিয়ে জীবনের কয়েকটা গূঢ় সত্য যেন বলতে গিয়েও বলেন না। একটু ছুঁয়ে চলে যান। দূর থেকে ইঙ্গিতে বোঝান আমাদের। কিন্তু, এরপরেই একটা soundscape আর ক্যামেরার যুগান্তকারী কাজ করে আমাদের চমকে দেন। গরুর গাড়ির পায়ের ছাপের পাশাপাশি স্ক্রিনে বারবার ঝলকে উঠতে থাকে রেললাইনের ছবি, গরুদুটি চালকের হ্যাট হ্যাট আওয়াজের সাথে পেছনে লাথি খেয়ে দৌড়ে এবার প্রচণ্ড বেগে গাড়ি টানতে থাকে আর পেছনে রেলগাড়ি চলার আওয়াজের অবিশ্বাস্য synchronisation-র সাথে সাথে ভুবন সোমের সমস্ত চলার পথ এক হয়ে যায়।
অন্তর্ঘাতের কথা, পারস্পরিক সংঘাতের কথা বলছিলাম। গ্রামে ঢুকে মোষের তাড়া খাওয়ার পর ভুবন সোমের আকস্মিকভাবে দেখা হয় মোষটির মালকিন গৌরীর সঙ্গে। তাঁদের বাড়ির আতিথেয়তা পান ভুবন। কিন্তু, এরপরেই স্পষ্টতর হতে থাকে Urban vs Rural sensibility-র সংঘাত। একের পর এক nonlinear ফ্রেমে আর soundscape -এ বারবার মৃণাল সেন নিয়ে আসেন এই পারস্পরিক সংঘাতগুলো। আমরা দেখতে পাই গৌরীর সাহায্যে ভুবন অপেক্ষা করতে থাকেন পাখি-শিকারের, (সেই 'অপেক্ষা'র কথা আবার আচমকাই চলে আসে সিনেমা-নির্মাণের বুনটে) কিন্তু বারবার হেরে যান। শেষে এক সময় ভেবে নেন, বোধহয় পেরেছেন কিন্তু পরমুহূর্তেই স্বপ্নভঙ্গের মত গৌরী এসে তার ভুল ভাঙায়– এ পাখি গুলিতে নয় বরং বন্দুকের আওয়াজে ভয় পেয়ে পড়ে গেছে। বন্দুকের আওয়াজের পর হুহু করে বেজে ওঠে বেজে ওঠে major flat seventh আর আমাদের কাছে মুহূর্তে পরিষ্কার হয়ে যায়, ভুবন সোমের pseudo-achievement imbued with despair -এর চরিত্রটা।
কিন্তু এই একের পর এক সংঘাত আসলে মৃণাল সেন নিয়ে আসেন অনেকটাই লুকিয়ে রাখার চালে। ভুবন সোমের আপাত গাম্ভীর্য আর 'গাম্বাট'-পনার সাথে গৌরীর নির্ভেজাল সারল্য, গৌরীর আন্তরিকতার সাথে ভুবন সোমের সহজ না হতে পারার অস্বস্তি, পাখি-শিকারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মতপার্থক্য, যে গৌরী ময়না পোষে এবং পাখি ভালোবাসে তারই পাখি-শিকারের তরিকা সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা (“বিড়ি ফেলো, পাখি উড়ে যাবে” কিংবা ভুবনকে গাছ সাজার বুদ্ধি দেওয়া) বনাম শহুরে ভুবনের এ ব্যপারে অজ্ঞতা - এই সব চূড়ান্ত ঘরঘরে অস্বস্তি নিয়ে সিনেমার ন্যারেটিভকে সপ্রতিভ ভাবে বুনতে থাকেন পরিচালক। সিনেমার একটি মুহূর্ত একবারের জন্যও আরোপিত মনে হয় না।
এই সিনেমার ক্লাইম্যাক্সের কথা আপাতত সচেতন ভাবে এড়িয়ে যাচ্ছি। আমার নিজের কাছে এই সিনেমার ক্লাইম্যাক্সটি অভাবনীয় কিছু নয়। অন্তত মৃণাল সেনের মাপের পরিচালকের জন্যে তো নয়ই। সাধারণ দর্শক একটা সময়ের পর থেকে এ ব্যাপারে আন্দাজ করে নিতে পারেন। তবে ক্লাইম্যাক্সেও বারবারের মত ফিরিয়ে আনেন পরিচালক সেই রেলগাড়ির চাকার ঘর্ষণের আওয়াজ। এর পাশেই টিকিট কালেক্টর যাদব প্যাটেল এবং ভুবন সোমের মুখ গোটা স্ক্রিন জুড়ে একই সাথে বারবার ঘষটাতে থাকে। যারা এই সিনেমা দেখেছেন তারা, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন এতক্ষণে একটা sound motifকে কীভাবে এই সিনেমার গায়ে পরতে পরতে বুনে দিয়েছেন মৃণাল সেন।
(জানি অনেক কিছু বলা হলনা এই লেখায়, যেমন animation-র ব্যবহারের কথাটাও বলার দরকার ছিল। কিন্তু সে না হয় অন্যদিন লিখব। ফিরে ফিরে আসতে হয় একেকটা সিনেমার কাছে। অসমাপ্ত লেখার কাছে, শব্দের কাছে।)
এই লেখার তৃতীয় এবং শেষ বিষয় magicrealism র একটা বাংলা সিনেমায় avant-garde ব্যবহার। আমি সিনেমার প্রায় শেষ অংশের denoument -র কথা বলছি যখন গৌরী আর ভুবন এক পুরোনো রাজবাড়িতে যায়। এবার বারান্দায় বাইনোকুলারে পাখি দেখার দৃশ্যটি মনে করুন। পুরো সিনেমাতে যেটা আমরা মনে মনে চেয়েও ভাবি, পরিচালক বোধহয় এটা কক্ষনো করবেন না, সেটাই ঘটে যায়। প্রথমবার গৌরীর সাজানো পাগড়িতে ভুবনকে রাজার মত আর তার পাশে গৌরীকে রাণীর মত দেখতে লাগে। কিন্তু এখানে যাদুবাস্তবতার কথা কেন বলছি? কারণ, এই ভূতুড়ে বাড়ি থেকে একটানা বালির প্রান্তরে ভুবন সোমের পাখি শিকারের দৃশ্য অবধি আমার কাছে বাস্তবানুগ হয়েও সাধারণ বাস্তব নয় বরং একটি আদ্যোপান্ত স্বপ্নের মুহূর্ত- ভুবনের ইচ্ছের আর অপেক্ষার একটা পরিণতি। ভুবনের মত মানুষ কোনদিনই হয়তো পাকা শিকারি অথবা অফিসের ভালো বস হতে পারবেন না, কিন্তু একটু একটু করে পা-পিছলে যাওয়ার মত ভুল করে কখনও কখনও জীবনে একটু সময়ের জন্য হলেও ভালো হয়ে ফেলবেন, ভালো কিছু করে ফেলবেন। আর তাই কখনও কখনও গৌরীর মত কেউ তার জীবনে একটা রূক্ষ দুপুরে এসেও তাকে একটু নরম করে দেবে।
এই পুরো ব্যাপারটা অনেকটা স্বচ্ছ হয়ে যায় যখন দিগন্তজোড়া বালির মধ্যে গুলি চালানোর আগে গৌরী ভুবনের কাঁধে হাত রাখে। কেউ নেই এমন একজন 'সদা-সিঙ্গল' মানুষের জন্যে এমন একটা হাত এক লহমার জন্যেই যথেষ্ট, সুস্থ হওয়ার জন্যে যথেষ্ট। ক্যামেরা এক সেকেন্ডের জন্যে freeze হয়ে যায় ভুবনের কাঁধে রাখা গৌরীর হাতের ওপর আর তারপর গুলির আওয়াজ। আরেকবার ব্যর্থ ভুবন। আরও ব্যর্থ হবে সে, অনেক অনেকবার। কিন্তু তারপরেও তাকিয়ে দেখবে এত মরুভূমি, এত হাওয়া আর আকাশে যুথবদ্ধভাবে উড়ে যাওয়া পাখির ঝাঁক। মানুষকে, মানুষের পাপকে, যাদবের ঘুষ খাওয়াকে, আইনের ওপরে কোন অস্তিত্বের কথা, ধর্মের কথা ভেবে শেষ অবধি ক্ষমা করে দিতে হবে ভুবন সোমের মত আমাদের অনেককেই কারণ -
"পৃথিবী ভাঙছে
পুড়ছে
ছিন্নভিন্ন হচ্ছে
তবু মানুষ বেঁচেবর্তে থাকে
মমত্বে
ভালবাসায়
সহমর্মিতায়"
১২ মার্চ, ২০২৩
Comments
Post a Comment