Skip to main content

রবীন্দ্রনাথ? তিনি বৃদ্ধ হলেন

 আজ সকাল থেকে রবীন্দ্রনাথ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আমরা নিজেদের নিয়ে লিখছি। নিজেদের শব্দ লিখছি ; আয়ু লিখছি, প্রেম লিখছি। বয়ে যাওয়া অথবা ক্ষয়ে যাওয়া বিকেল-দুপুরবেলা নিয়ে লিখছি। আমরা কেউ ভাবছি আমাদের একটা ফেসবুক রিলে দশ হাজার views কিংবা ১০০০ subscribers হতে হবে। কোনো প্রকাশক বা ইনফ্লুয়েন্সর আমাদের অত্যন্ত খাজা একটি লেখা "মুগ্ধ হলাম" বা "নিরন্তর ভালোবাসা" এইসব লিখে ছড়িয়ে দেবেন বনে, বনাান্তরে।

আমিও তার ব্যতিক্রম নই। একটা বোতল খুলে এইসব লিখছি।
কিন্তু এরই মধ্যে আমাদের কারো কারো মনে হয়েছিল - ঐ সকালবেলাটা তো থেকে মন্দ ছিল না! আমি একটা হলদে পাঞ্জাবী পরে স্কুলে যাব। গাইব; বা, একটা কবিতা বলে নেব না হয়। আমাকে, ও দেখবে পাঞ্জাবিতে। হলদে পাঞ্জাবিতে। তখন, মিস্সি রোটির কথা মাথায় থাকবে না। ওই বয়সে একটু যাদবপুরের মাঠে সন্ধ্যে নামবে। আর অতল কালো স্নেহের মাঝে ডুবে আমরা স্নিগ্ধ হব।
সেই সমস্ত সন্ধ্যেগুলোতে আমাদের 'আশ্চর্য নতুনভাবে দেখা হয়েছিল'। এখনও আশ্চর্য লাগে। অথচ তখন লাগত না। আমি তোমাকে ম্যাকবেথ শুনিয়েছিলাম। কারণ, আমার স্মৃতিতে সম্পূর্ণ ম্যাকবেথ ধরে রাখা সেই বয়সে কোন আশ্চর্য ঘটনা ছিল না। কারণ তখন ফেসবুকে এই মুগ্ধতার দাবি ছিল না।
আরে! আমি, তখন যাদবপুর! আমরা তারপর একটু বাবাইদার দোকানে মোমো খেলাম। তুমি? তুমি তো ওর বোন। আর ও? আমার সেরা বন্ধু। বুক ছুঁয়ে যাচ্ছিলে। আর আমার খানিকটা ব্যাগ আর হাতের কোনা। আমি কী বলব? তুমিই বললে, "তৃপ্তিতে যাবে আজ?"
এদিকে আমি তখনই তৃপ্ত। আমাকে তুমি বলেছিলে, "ক্লাস এইটে কী যেন একটা অভ্যেস ছিল তোমার?"
"হুঁ, কবিতা মুখস্থ করার।"
"লালমোহনবাবু তোমার বয়সে 'দেবতার গ্রাস' গুলে খেয়েছিলেন। আর তুমি তো আঁতেল। তুমি এটা এখন বলে শোনাও তো?"
"Oui, volontiers!
গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে
মৈত্র মহাশয় যাবেন সাগরসংগমে
তীর্থস্নান লাগি। সঙ্গীদল গেল জুটি
কত বালবৃদ্ধ নরনারী; নৌকা দুটি
প্রস্তুত হইল ঘাটে..."
এক সেকেন্ড
দু সেকেন্ড
তিন সেকেন্ড
চার সেকেন্ড
পাঁচ...
হঠাৎ ওদিকে তুমি,
"...পুণ্য লোভাতুর
মোক্ষদা কহিল আসি, "হে দাদাঠাকুর,
আমি তব হব সাথি।' বিধবা যুবতী,
দুখানি করুণ আঁখি মানে না যুকতি,
কেবল মিনতি করে--অনুরোধ তার
এড়ানো কঠিন বড়ো--"স্থান কোথা আর'
মৈত্র কহিলেন তারে। "পায়ে ধরি তব'
বিধবা কহিল কাঁদি, "স্থান করি লব
কোনোমতে এক ধারে।' ভিজে গেল..."
"ধুর দাঁড়া, তুই কী বলতো?"
"আমি কিছুই না। আচ্ছা "শুভক্ষণ" কবিতাটা বলো। অঙ্ক পরীক্ষা আগের দিন মুখস্থ করেছিলে না? ক্লাস এইটে? এবার বলো।"
"থাম্ ভাই।"
"পরের সপ্তাহে মুখস্থ করবে। তারপর আমার সাথে তৃপ্তিতে যাবে। তিনটে বাড্ ম্যাগনাম খেয়ে কবিতাটা শোনাবে‌। তারপর ভাবব।"
সেই সন্ধ্যের পর থেকে রবীন্দ্রনাথ শুধু ২৫শে বৈশাখ ছাড়া আর আমাদের কাছে কোনদিন আসেন না।
একেকটা বছর আর এক একটা সন্ধ্যা হয়ে যায়।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে কেউ কেউ অনুষ্ঠান করেন বলে শুনেছি।
আর পার্ক স্ট্রিটে বিকেল হয়। এখন আর কেউ জ্যাজ্ শোনেনা। John Bayes or Backstreet Boys-এর অনুরোধ আসে না Someplace Else-এ। 'কাঁচা বাদাম' বাজে।
আর এদিকে আমরা এই ২০২৩-এ আন্তর্জাতিক হব বলে "কতবারও ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া" গেয়ে বলে প্রপোজ করে যাই। "দেবব্রত" নামটা বদলে "জর্জ" কিংবা "মধুসূদন" থেকে "মাইকেল" হয়ে পড়ি।
১০ মে, ২০২৩

Comments

Popular posts from this blog

অনাদায়

  ১। যে আঁচেতে পুড়ে যাওয়া একটু একটু করে, সে আগুন তোমার তো নয় জানি। তবে? বসুধা কুটুমবাড়ি, অতএব পুড়ে যেতে হবে। কোথায় জ্বলছে পেট, কোথায় চাকরি, বাড়ি, যেদিকে তাকাই সবাই ছুট্টে আসে, জন্মপঞ্জি নিয়ে। মা বাবার পরিচয় চায়। ওরা বলে, দেখছ না? একই তো পেটের ফল। আর বল্‌, পাপ নিবি কি না? এই পাপ আমাদের একা করে কোন খাদে নিয়ে যাবে, এখনও জানি না।       ২। এমন করলে কেন? বুঝেছিলে মৃত্যু আসীন? এ প্রশ্নে একটি রক্তবাণ বিদ্ধ করে, সমস্ত দিন, সমস্ত রাত নির্ঘুম। দিনে রাতে পেয়াদার ডাক, আড়ং ধোলাই আসে আকাশকুসুমে, থাক থাক, আর মেরো না খোদাতালা, প্রভুর দাসেরে। বল সুবিনীত হবে? হব, তবে তোমার জন্যে এই টক্সিক উপোস-কানুন নেশা জানিনা কিচ্ছুটি, শেষ হবে কবে।     ৩। নিজের দূরাত্মীয়, সেই হল এখন প্রথমা। ভেবেছিলে সেটাই দায়িত্ববোধ। একবার হাত পাতলে সেই হাত ফিরে ফেরে, সেটা জানতে না বুঝি? বলেছিল তোমার আত্মজ। আসল আত্মীয় কে? অন্য কেউ? দুরাত্মা? জারজ?     ৪। এটুকু কিছুই নয়। ঢের বাকি আছে। সামাজিক অপমান , পুলিশ , আদালত , পাড়াছাড়া। র...

পাড়া ক্রিকেট

  নিয়ে আয় খেলোয়াড়ি বল, উড়ুক তুফানে উইকেট‌; আগেভাগে পিচটিচ ঠিক কর তোরা – আমার উদ্যানে। বাড়ির সামনে চেঁচা উত্তাল - "ভাই, ভাই ওটা পায়ে‌ লেগেছিল", ভেঙে ফ্যাল আমাদের নিশ্চুপ পাড়ার বিকেলঘুম, নিজের দিকেতে শাসানির চারটে আঙুল, আর বিরুদ্ধতার তর্জনী। আমাদের শীতকাল, বয়স বিরুদ্ধতা জুড়িয়ে উঠুক, জুড়িয়ে উঠুক সব বন্ধুতা বিচ্ছেদ, চাকরির অপলাপ এইচ-আর সালিশী সভা; আর জুড়িয়ে তুবড়ে দে, দে তো‌ দেখি, হিংসুটে দৈত্যের বাগানেতে অপ্রতিম কাঁটাগাছ, আর ভেতরেতে নুয়ে পড়া করুণ জবা। মধ্যবয়সে যারা বুড়ো ভাম, ভীমরতি প্রাপ্তির সামান্য দূরে – এটুকু মানতে পারি, আমাদের বাপ, মা, কাকারাই পাড়ায় পাড়ায় আদরে, বেনামে, কালো টাকা আর সবুজ উদ্যানে, ফেলেছে সিন্ডিকেট, নির্মিয়মাণ ফ্ল্যাট, ফণীমনসার কাঁটা বেড়ার স্তবক। এখন বিকেল হল। আমার পাড়াকে তোরা টেনে আন উদ্যানে। আমাদের আওয়াজের ভদ্রতা ভয়টুকু ব্যাটেতে, বলেতে নাচা- "আউট, আউট"। শেখা ঢের বাকি আছে নীতি বা সবক। ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

বাগানবিলাস

  তোমার সমস্ত উত্তরের সামনে নিশ্চুপ হয়ে বসি। এই দেখেছ বাগানে নিম তুলসি এই দেখো না মৌটুসী মেনে নেয় কেমন ফুলকপির ডাঁটে গড়ে ওঠে নিস্তব্ধ জবা। তোমার খোলা বুকের ফোঁটার দিকে তাকিয়ে থাকি আর মনে হয় এবছর শেয়ারবাজারে সারের ফলন হবে ভালো।