কালকেই এক বন্ধুর টাইমলাইনে পড়ছিলাম একটা লেখা। কীভাবে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম সর্বস্ব হতে হতে আমাদের এক নাগাড়ে একটা বড় উপন্যাস পড়তে কিংবা আড়াই ঘন্টার মননশীল সিনেমা দেখতে ধৈর্য্যচ্যুতি হচ্ছে প্রত্যেকদিন। পড়তে পড়তে এটাও মনে হচ্ছিল আমি ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউব-শর্টস দেখিনা খুব একটা। ফেসবুকে রিলস্-ও দেখিনা। অথচ, এই সমস্যা তো আমারও। মোবাইল আসক্তি তো রয়েছে এসবে কোনভাবে আসক্ত না হওয়া সত্ত্বেও। কেন হচ্ছে? একটা আড্ডা দিতে দিতে মোবাইলে ঢুকে পড়ি আমরা অনেকেই।
আমিও কি ঢুকে পড়ি?
এসব ভাবতে ভাবতে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল, আর বুঝছিলাম, এখনও অন্তত আমার জন্য একথা সত্যি নয়। তবে এটা ঠিক যে, ধৈর্য্যের দৈর্ঘ্য আমারও কমেছে। সেটা বুঝতে পারি অন্যভাবে একটা বিষয়ে পড়াশোনা করতে করতে সেই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত আরেকটা বিষয়, তার থেকে আরেকটি বিষয়, তার থেকে আরেকটি বিষয় চলে যাওয়ার সময়। আর, এ শুধু কথা বলার ক্ষেত্রে নয়, বরং ইন্টারনেটে সার্চ করার ক্ষেত্রেও আমি লক্ষ্য করেছি যে, এটা
আমারও হচ্ছে।
এ সমস্যা আগেও ছিল। অনেক অধ্যাপককে এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে যেতে যেতে মূল বিষয় হারিয়ে ফেলতে দেখেছি। কিন্তু আগে মোবাইল খুলে দু'মিনিট অন্য কিছু দেখে তারপরে মনে করতে হত না যে, মোবাইলটা ঠিক কী কারণে হাতে নিয়েছিলাম, কোন বিষয়ট নিয়ে পড়াশোনা করব বা খুঁজব বলে।
কাল সন্ধ্যেবেলা বন্ধু বেরনার এসেছিল। আমরা তিন ঘন্টা আড্ডা দিলাম দুটো বিয়ার খেতে খেতে। মোবাইল আমরা খুলেছি, কিন্তু তাতে ডুব না দিয়ে, আমাদের ভাষিক যাপন বন্ধ না করে। বরং, তাকে ব্যবহার করেছি তথ্যের জন্য। গিয়োম আপলোনেরের কবিতা, তারপর পল এলুয়ার, রবের দেসনস এঁরা, অন্যান্য ফরাসি সাহিত্যিক কিংবা ইদানিংকালের গিয়োম মুসো এঁদের সম্বন্ধে কথা হচ্ছিল। এঁদের লেখা নিয়ে ফরাসি সাহিত্যের ওপর ইউটিউব একটা চ্যানেল খোলা যায় কিনা, কিংবা ইউটিউব বিষয়টা আদৌ কীভাবে কাজ করে সেটা বোঝার জন্যই ছিল ওর অফুরান উৎসাহ। হ্যাঁ, ৬০ বছরের ফরাসিরাও technologically dumb হয়। হতেই পারে।
আসলে, সমস্যা তো মোবাইলে নেই। সমস্যা হল এই সোশ্যাল মিডিয়া যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তারা আমাদের দুর্বল জায়গাটুকু ভালো বোঝেন। বড় বড় মনোবিদ রাখেন এরা। তারা জানেন কীভাবে আমাদের নরম অস্বস্তিটুকু নিংড়ে নিতে হয়। একজন কনজিউমার হিসেবে, সচেতনতা বলে যে একটা জিনিস আছে তা আমরা অনেক সময় স্বীকার করি না বরং বাজার যা দিচ্ছে, সেটাই মেনে নিই আর মনে করি আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো।
সচেতন অবিশ্বাসের লালন করতে করতেই বোধহয় এই অসুন্দর সময়ে আমরা একটু নিখাদ আড্ডা দিতে পারি। মোবাইল তুলতে পারি ঠিক তখনই, যখন সত্যিই কিছু একটা খুঁজতে হয়। আর সেটা একটা ডিকশনারি বা বিশ্বকোষ ঘাঁটার থেকে সোজা - এই ভেবে; মোবাইল ছাড়া আড্ডা অপরিহার্য - এই ভেবে নয়।
৪ আগস্ট, ২০২৩
Comments
Post a Comment