এসময় যখন আমরা একটা যুগোপযোগী শিল্পের ভাষা খুজছি, কীভাবে ঠিক আজকের এই দিনের সংকটগুলো ধরতে পারা যায় তার তত্ত্বতালাশ চালিয়ে যাচ্ছি, তখন একটা প্রশ্নের সামনে এসে বারবার ধাক্কা খাই আমি। খোঁজ জরুরী নিঃসন্দেহে, কিন্তু আমাদের শ্রোতা কিংবা দর্শকদের আমাদের অক্ষম র্যাবিট-টেস্টের ফসলগুলোকেই একটা চকচকে মোড়কের আড়ালে প্রতিদিন তুলে দিচ্ছিনা তো? শুধু OTT সংস্কৃতি আর ইন্সটা-ফেসবুকযাপনই কি আমাদের বই, ছবি, মননশীল সিনেমা বা থিয়েটার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে না এর পেছনে দায় আমাদেরও?
এর প্রমিত উত্তর আমার এখনও জানা নেই। তবে, রোববার বিকেলে মধুসূদন মঞ্চে "হারানের নাতজামাই" নাটক দেখতে দেখতে এর একটা চমৎকার antithesis পাওয়া গেল। একটা পুরোনো দিনের নাটকের ধাঁচে, পুরোনো দিনের গল্প বলতে বলতেও যে আজকের সময়ের ক্রাইসিসগুলো চটজলদি ধরে ফেলা যায়, তা দেখিয়ে দিল আমাকে এই নাটক।
৮৬ বছর বয়সে অরুণ মুখোপাধ্যায় আবার একটি নাটকের নির্দেশক। সত্যি বলতে একজন মানুষ এই বয়সে কীভাবে এই প্রাণশক্তি পান আর তার কতটা প্রতিফলন স্টেজে অভিনয়ে এবং নাট্য নির্মাণে ধরা পড়ে – এই অভিজ্ঞতার সামনে নতজানু হতেই সেদিন সন্ধ্যেবেলা যাওয়া। তাই Sangita Pal দি’র পোষ্টে এই নাটকের অভিনয়ের খবর পেয়ে এক মুহূর্ত দেরী করি নি। অনলাইন টিকিট কেটেছিলাম।
বিরতিসহ আড়াই ঘণ্টার দীর্ঘ এই নাটক আমাদের ধরে রাখতে পারল তাহলে? যে সময়ে দাঁড়িয়ে একটা তিরিশ মিনিটের ক্লাস, ১৫০০ শব্দের ছোটগল্প কিংবা ১৫ মিনিটের বিশ্লেষণ ধর্মী আলোচনা আমাদের অনেক প্রলম্বিত বলে মনে হয় বলেই Five minutes class, micro fiction বা YouTube/Instagram shorts-র মত genre গুলোর উদ্ভাবন- সেসময় দাঁড়িয়ে এমন একটা (দুঃ)সাহসী পদক্ষেপ?
হ্যাঁ। এই নাটক দেখতে গিয়ে আদ্যোপান্ত একটা প্রযত্নের সামনে (যেটা সচরাচর পাইনা এখন) থমকে ছিলাম আমি। মঞ্চ নির্মাণ, অভিনয়, আলো, লোকগানের এবং বিশেষ করে কোন pre-recorded আবহের বদলের সম্পূর্ণ organic আবহের ব্যবহার – প্রত্যেক বিষয়েই এই নাটক যেন আজকের যেকোন নির্মাতা /শিক্ষার্থীর কাছে একটা crash course-র মডেল। কিন্তু একজন দর্শক হিসেবে আমি কী দেখছি? মঞ্চে আলো জ্বলে উঠলে আমার চোখে পড়ছে মঞ্ছসজ্জার অংশ হিসেবে একটি ঝুলন্ত লাঙ্গল যা এই নাটকের প্রেক্ষাপটের (তেভাগা আন্দোলন) উপস্থাপক। এই লাঙ্গল বারবার জ্বলে ওঠে ভাগচাষীদের আত্মপ্রত্যয়ের কথা বলতে, জোতদারদের নির্মমতার কথা বলতে। অনেক রক্তক্ষরণের গল্প সরাসরি বলা হয়না এই নাটকে। শুধু ময়না, ময়নার মা, বোষ্টমীর মত নারীচরিত্রেরা জীবনের প্রতিটি নিষ্ঠুরতার সামনে একবার গুঁড়িয়ে যেতে যেতে, রক্তাক্ত হতে হতে মাথা উঁচু করার সাহস পায়। নারীস্বাতন্ত্রের নাটক না হয়েও এই নাটকের ক্লাইম্যাক্সে যেন এরই জয়।
অভিনয় এ নাটকের সম্পদ। মেঘনাদ ভট্টাচার্য, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায় বা সৌমিত্র বসুরা তো বটেই কিন্তু একজন সক্ষম নির্দেশক যে আসলে সমস্ত অভিনেতাদের দিয়েই তাদের সেরা অভিনয়টুকু নিংড়ে নিতে পারেন, তা এই নাটক আরেকবার প্রমাণ করে। সামগ্রিকভাবে কারও অভিনয়ের কোন নির্দিষ্ট দুর্বলতাই চোখে পড়েনা। সমস্ত চরিত্রই যেন এক তারে কথা বলে, গেয়ে ওঠে ঠিক ঠিক হারমোনিয়াম, বাঁশি আর খোলের সাথে গলা মিলিয়ে। বেসুরো ঠেকেনা একটুও। তবে, মঞ্চসজ্জার কথা আলাদা করে বলতেই হয়। আপাতসাধারণ এই মঞ্চই আলো নিভে গেলে হয়ে ওঠে একটা ক্যানভাস। সারা স্টেজ জুড়ে তখন তেভাগা আন্দোলনের ছবি।
আজ এই গল্প কেন? কারণ, এই নাটক আসলে একটা মূল্যবোধ, টাকার বিনিময়ে নিজেকে বিকিয়ে না দেওয়া এবং আমাদের বৃহত্তর অস্তিত্বের কথা বলে। বলে আরো বেঁধে –বেঁধে থাকা এখনও প্রাসঙ্গিক। দক্ষিণপন্থার এই প্রবল সময়ে সুন্দর থাকা, একসাথে নিজেদের অধিকারটুকু অফিসে, বাজারে, পাড়াতে সংরক্ষিত করা এবং একে অন্যের পাশাপাশি থাকা কোন লোক দেখানো বিষয় নয় বরং একটা ন্যূনতম প্রয়োজন এসব বুঝিয়ে দেয় এই নাটক আমাদের। “আর কত ছোট হব ঈশ্বর?” কেনই বা হব?
এই নাটক দেখা প্রয়োজন। কারণ, কিছু কথা বারবার বলা আজও প্রাসঙ্গিক। যারা ভুলে যান, তাদের মনে করিয়ে দিতে হয়। এই নাটক আমাদের সেটাই করায়, যেমন সবসময়েই একটা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ শৈল্পিক কাজগুলো করে এসেছে।
21 March, 2023
Comments
Post a Comment