Skip to main content

সমরেশ মজুমদার

 আমার তেমন পড়ার অভ্যেস তৈরী হওয়ার আগেই লেখা হয়ে গেছে উত্তরাধিকার-কালবেলা-কালপুরুষ। মৌষলকাল তার একটু পরে। কিন্তু তখনও সোশ্যাল মিডিয়ার বাড়বাড়ন্তে এক নাগাড়ে পড়ার ইচ্ছেটা ওলটপালট হয়ে যায়নি। তখন অরকুট ছিল। আমি তখন ক্লাস এইট। টিনএজের প্রথম ভাগ। আমি তখন মফস্বলী। কলকাতা শহরে মাসে দু’বার গান শিখতে এলে, শহরটাতে জন্ম হয়নি বলে একটা আফসোস এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়।

তো, একদিন অরকুটে আলাপ হয়েছিল উল্কা নামে একটি মেয়ের সাথে। অদ্ভুত নাম। কলকাতায় আমার যেখানে ফ্ল্যাট (তখনও এই ফ্ল্যাটটাই ছিল), তার খুব কাছে থাকে, বলেছিল আমায়।
-বই পড়ো?
-হুঁ।
-কী বই?
-কালপুরুষ পড়লাম recently।
-সেটা কী?
আমি তখনও টিনটিন, কাকাবাবু আর ডান ব্রাউন সামলাচ্ছি।
-সমরেশ মজুমদারের।
- ও, আচ্ছা। তো কী ভালো লাগলো এই বইটাতে?
- ওই, ওই, ওই যে সময়টা আর ওদের ওপর কী অত্যাচারটাই করেছে। That touched me a lot!
আমি তখন বইগুলোর কাছাকাছি যাব ভাবছি। আসলে ওর কাছাকাছি যেতে হবে। মার্ক্স জানিনা। নকশাল কী বা কারা, সেসব বোঝার দরকার নেই আমার। কিন্তু, এই বইটা পড়ে এমন একটা কিছু বলতে হবে, যাতে উল্কা চমকে যায়। বইটা কি পাওয়া যাবে মালদায়? জন্মদিনের পাওয়া ৫০০টাকা আছে এখনও। সাইকেল, সাইকেল… চালাও পানসি… আমাকে নিয়ে চল বীণাপাণি বুক হাউসে।
বইটা ঝটপট পেয়ে যাই সেদিনই। আর তারপর ক্লাস এইটের সেইসব দুপুরবেলার ভাতঘুম একটু দেরি করে আসতে শুরু করে। 'কালবেলা' বইটা পাশে রাখি আর পাতার গন্ধ নিই। মনে হয়, এই শব্দগুলো, এই বাক্যগুলো ওর ভালো লেগেছে। সমরেশ মজুমদার লোকটা কে? এভাবে ওকে পেড়ে ফেলল? ভাবি কোনদিন কলকাতাতে থাকব। এই শহরের সাথে, উল্কার সাথে আমার দেখা হয়ে যাবে। সমরেশ মজুমদারের সাথে বইমেলায় দেখা হবে।
অনেক বছর পর দ্বিতীয়টা হয়ে যায়। প্রথমটা আর হয়ে ওঠেনি। কিন্তু, উল্কার মতই হঠাৎ হারিয়ে যাওয়ার আগে ও আমাকে সমরেশ মজুমদার এনে দিয়েছিল।
পরে জানতে পারি, আমার জেঠিমা এক সময় উত্তরাধিকার-কালবেলা-কালপুরুষ যখন ধারাবাহিকভাবে বেরোচ্ছিল তখনই পছন্দসই বইয়ের তালিকায় এসব লেখাকে ফেলে দেয় আর পত্রিকার থেকে পাতা কেটে কেটে বাঁধাই করে বানিয়ে ফেলে আস্ত তিনটে বই। সেসব বাড়িতেই রাখা আছে। অতঃকিম্? তিনটে উপন্যাসই একমাসের মধ্যে আমার পড়া।
আমি ‘পথের পাঁচালি’ পড়ার আগে কালবেলা পড়েছি। আনপুটডাউনেবেল- কাকে বলে সে আমি প্রথম বুঝি কালবেলা পড়ে।
এরও অনেক বছর পর একদিন ২০১৭-র মাঝামাঝি অফিসে নাইট শিফটে তেমন কাজ নেই। ইউটিউব ঘাঁটতে ঘাঁটতে পেয়ে গেছিলাম ‘চলো অঞ্জন’-এর একটা এপিসোডে সমরেশ মজুমদার আর অঞ্জন দত্তের সাক্ষাৎকার। (এখানে তার অংশবিশেষ তুলে দিলাম।)
অনেক বড় হয়েও দেখেছি, আমাদের বোঝানো হয় শিল্প আর টাকা – একসাথে যায়না। অথচ, কাজ করতে গিয়ে প্রত্যেক মুহূর্তে যখন এর উলটোটাই দেখতে পেয়েছি, তখন নিজেকে বারবার একটা প্রশ্নের ঝাঁকুনি খেতে হয়েছে – তাহলে কি আমার প্রিয় গায়ক, লেখক, অভিনেতারা শিল্পী নন? শেক্সপিয়রও তো শুনেছি টাকার জন্যেই লিখতেন।
উত্তরটা পেয়েছিলাম প্রথম এই সমরেশ মজুমদারের সাক্ষাৎকারেই। আর তারপর অনেকবছর পর এডিনবার্গের একটা ক্রিয়েটিভ রাইটিং স্কুলের অনলাইন একটা কোর্স করতে গিয়ে, যেখানে প্রথমদিনই আমাদের শেখানো হয়েছিল – লেখার বাজার সম্পর্কে সচেতন না হয়ে এক লাইনও লিখবেনা।
আমাকে এক অস্বস্তিকর স্বস্তির সামনে দাঁড় করে দিয়েছিলেন সমরেশ মজুমদার। কালবেলা পড়ার সেই দুপুর থেকে অফিসের রাত অবধি ; বারবার।
আর সেই অস্বস্তিকর সত্যি বলার অভ্যেস নিয়েই এখনও বড় হচ্ছি আমি আর দেখছি অপ্রয়োজনীয় মানুষেরা আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছেন।
To leave a lean life, you need to stand naked in front of such uncomfortable truths.
আমাকে আপনি সাবালক করে দিয়ে গেলেন, স্যার।

8 May, 2023

Comments

Popular posts from this blog

অনাদায়

  ১। যে আঁচেতে পুড়ে যাওয়া একটু একটু করে, সে আগুন তোমার তো নয় জানি। তবে? বসুধা কুটুমবাড়ি, অতএব পুড়ে যেতে হবে। কোথায় জ্বলছে পেট, কোথায় চাকরি, বাড়ি, যেদিকে তাকাই সবাই ছুট্টে আসে, জন্মপঞ্জি নিয়ে। মা বাবার পরিচয় চায়। ওরা বলে, দেখছ না? একই তো পেটের ফল। আর বল্‌, পাপ নিবি কি না? এই পাপ আমাদের একা করে কোন খাদে নিয়ে যাবে, এখনও জানি না।       ২। এমন করলে কেন? বুঝেছিলে মৃত্যু আসীন? এ প্রশ্নে একটি রক্তবাণ বিদ্ধ করে, সমস্ত দিন, সমস্ত রাত নির্ঘুম। দিনে রাতে পেয়াদার ডাক, আড়ং ধোলাই আসে আকাশকুসুমে, থাক থাক, আর মেরো না খোদাতালা, প্রভুর দাসেরে। বল সুবিনীত হবে? হব, তবে তোমার জন্যে এই টক্সিক উপোস-কানুন নেশা জানিনা কিচ্ছুটি, শেষ হবে কবে।     ৩। নিজের দূরাত্মীয়, সেই হল এখন প্রথমা। ভেবেছিলে সেটাই দায়িত্ববোধ। একবার হাত পাতলে সেই হাত ফিরে ফেরে, সেটা জানতে না বুঝি? বলেছিল তোমার আত্মজ। আসল আত্মীয় কে? অন্য কেউ? দুরাত্মা? জারজ?     ৪। এটুকু কিছুই নয়। ঢের বাকি আছে। সামাজিক অপমান , পুলিশ , আদালত , পাড়াছাড়া। র...

পাড়া ক্রিকেট

  নিয়ে আয় খেলোয়াড়ি বল, উড়ুক তুফানে উইকেট‌; আগেভাগে পিচটিচ ঠিক কর তোরা – আমার উদ্যানে। বাড়ির সামনে চেঁচা উত্তাল - "ভাই, ভাই ওটা পায়ে‌ লেগেছিল", ভেঙে ফ্যাল আমাদের নিশ্চুপ পাড়ার বিকেলঘুম, নিজের দিকেতে শাসানির চারটে আঙুল, আর বিরুদ্ধতার তর্জনী। আমাদের শীতকাল, বয়স বিরুদ্ধতা জুড়িয়ে উঠুক, জুড়িয়ে উঠুক সব বন্ধুতা বিচ্ছেদ, চাকরির অপলাপ এইচ-আর সালিশী সভা; আর জুড়িয়ে তুবড়ে দে, দে তো‌ দেখি, হিংসুটে দৈত্যের বাগানেতে অপ্রতিম কাঁটাগাছ, আর ভেতরেতে নুয়ে পড়া করুণ জবা। মধ্যবয়সে যারা বুড়ো ভাম, ভীমরতি প্রাপ্তির সামান্য দূরে – এটুকু মানতে পারি, আমাদের বাপ, মা, কাকারাই পাড়ায় পাড়ায় আদরে, বেনামে, কালো টাকা আর সবুজ উদ্যানে, ফেলেছে সিন্ডিকেট, নির্মিয়মাণ ফ্ল্যাট, ফণীমনসার কাঁটা বেড়ার স্তবক। এখন বিকেল হল। আমার পাড়াকে তোরা টেনে আন উদ্যানে। আমাদের আওয়াজের ভদ্রতা ভয়টুকু ব্যাটেতে, বলেতে নাচা- "আউট, আউট"। শেখা ঢের বাকি আছে নীতি বা সবক। ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

সুসংবাদ, এসো

সুসংবাদ আর আসেনা  আর সত্যিই আসেনা আমার এই দিনানুদিনে। অতএব, আমি তো সত্যিই এই ঝাকানাকা অতীতবিলাসটুকু ভাঙিয়ে খাই‌। আর মেয়ে পটাতে গিয়ে বলি, মাত্র পনেরোতে,  মানে তাও তো পনেরো হল, সুনীল গাঙ্গুলী আমাকে একদিন পিছলে পড়ে স্কচ খাইয়ে, নাকি কৃত্তিবাসে কবিতা ছাপিয়ে দেবে বলেছিল। হেঁ, হেঁ... কেউ কথা রাখেনি। কেউ কি রাখে? তাও তো হাফে... হাফ হাতা, শালা,  হাঁটুর বয়সে... খুশি। খুশি, মেড়ো মাল  নতুন বাংলা লিখা শিখেছে হাঁটুর বয়সে,  এই তো ইদ্রিস ওর হাঁটুর বয়সে, ব্যথা, বিয়ে হবে ওদের।  প্রজাপত্য। আর লেখা ছাপা হবে আনন্দ...আনন্দ, দেশ, আমাদের দেজ... এসো, সীমাহীন সুসংবাদ, এসো সুসংবাদ, এসো! ১৮ এপ্রিল,‌ ২০২৬