একটু বাইরে বেরিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম ঢাকুরিয়া ফুটওভার ব্রিজে। এখান থেকে ঢাকুরিয়া মোড় আর মধুসূদন মঞ্চের একটা aerial view পাওয়া যায়। ওপর থেকে, একটু তফাতে দাঁড়িয়ে সবকিছুই ভালো লাগে – মানুষের জীবনে না চাইলেও এসে যাওয়া একটা রবিবারের গতানুগতিক সন্ধ্যে আর এমন নিরুত্তাপ বিকেলেও আগে ঢোকার জন্য, ফাঁকতালে অন্যের আগে কিছু পাওয়ার চাহিদা, এলিয়ে দেওয়া আড্ডায় লেবু-চা, ঘটি গরম, ফুচকা-আলুর দমের দোকানে ত্রয়োদশী থেকে পঞ্চাশের ভীড় আরও কত কী। মনে হয়, এ সব প্রতিদিনের পাপ আজকাল আমাদের রক্তের ভেতর টলটল করছে। মহামারী এই শহরে আর আসবেনা কখনও। কারণ, সে আমাদের আজকের জন্য রেখে গেছে আরও গভীর পচনের দাগ। আমরা নিজেদের কোয়েস্ট মলের আর পাটায়াতে হলিডের বিল বেছে নিই অসুখে অসুখে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে যা যা কিছু পাওয়ার জন্যে আমরা দিনরাত ঝগড়া করতে গিয়ে আরেকবার নষ্ট হয়ে যাই – সে সব হিসেবেতে ঠিকঠিক পেয়ে যাব অচিরেই। আরেকজন একটু খারাপ থাকতে পারে। আমদের তাতে কিছু এসে যায় না। আমরা বিশ্বাস করে নেব, সেও খারাপের মধ্যে আসলে ভালো আছে কারণ তারও দেয়ালেতে ঠেকে আছে পিঠ। সেও অন্য আরেকটা আমি। সেও কাউকে খারাপ রেখেছে।
এভাবেই চলুক না, ক্ষতি কী?
তবে, আমাদের বিকেলের পথ আর ঢাকুরিয়া ব্রিজের সন্ধ্যেবেলাটা ঠিক এমন ছিলনা। আমরা সে সময়ে এ ব্রিজে এসে দাঁড়াতাম স্কুলের পর ট্যুইশন শেষে। একে অন্যকে বলতাম, "এই, দাঁড়া না। দেখ, দেখ। কী সুন্দর লাগছে।" আমাদের মোবাইলে ক্যামেরা ছিল না। তাই এই ব্রিজের ওপরে কোনদিন তোর একটা ছবি তুলে দেওয়া হয়নি। বেদুইনে একটা রোল নিয়ে বলতাম, বিল লাগবেনা। তাতে কাকুটা দু’টাকা কম নিত। একদিন সেটা নিয়ে আমাদের গ্রুপে নতুন ‘আশা’ অরুণিমার সামনে একটা সিগারেট ধরিয়েছিলাম। সিগারেট খাইনা আমি ; ভালোই লাগেনা। তবে সেদিন, অন্য অনেকে যে কারণে জীবনের প্রথম সিগারেট ধরায়, আমিও ধরিয়ে ফেলি কিছুটা না ভেবে। দুটো পাফের পরেই শুনতে পাই, “ও, হ্যালো! এখানে না। অন্য কোথাও গিয়ে…”
বুঝেছিলাম, এ পথের কোন আশা নেই। আর সেদিনের পর থেকে আমারও ঢাকুরিয়া ব্রিজের আড্ডাতে আসা আচমকা বন্ধ হয়ে যায়।
সিগারেট খাবনা ভাবি সেদিনের পর। কিন্তু অনেক ভাবা, ভাগ্যক্রমে এক একটা চুমুর পর সন্তর্পনে বেঁধে-বেঁধে থাকা সম্পর্ক পিছলে যাওয়ার মতই এ শপথ একসময় মচকে গেছে। আর তারপর বারবার এভাবেই আচমকা বেপাড়ায় ঢুকে পড়ে অপমান, বেফাঁস কথা বলে হঠাৎ বন্ধুত্ব হারানো, অনাবশ্যক সত্যিকে নিয়ে ঘর করতে করতে একদিন একঘরে হয়ে যাওয়া - কোনকিছুই আমাদের পেছন ছাড়েনি।
অরুণিমা, প্রিয়াঙ্কা, অঙ্কিতারাও একটা বয়সের পর আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসে। তখনই পরিচিত পাড়াতে হেঁটে আসি।মনে হয়, আমরা এখনও বসে আছি সেলিমপুরে ম্যামের বাড়িতে। ঢাকুরিয়া ব্রিজে সন্ধ্যে হওয়ার আগে পৌঁছে যাই বাস-ট্যাক্সির হুল্লোড় দেখব, তাই। একসময় সমস্ত ব্রিজ ঝলমল করে আলো জ্বলে ওঠে। ব্রিজের চারদিকে উৎকর্ণ হয়ে বেজে ওঠে অজস্র ট্রাফিকের হর্ণ। কলকাতা এখনও ষোলো আনা। তবে আমাদের ২০০৮-এর ‘সব পথ এসে মিলে যাওয়ার’ বাস ২০৬কে আর দেখতে পাই না। বেদুইন ধুঁকছে। এখানে একটা IndThalia ছিল। আমরা এলেই এদের সিগনেচার ক্যাফে মোকাটা (যেটার নাম Coffee Kiss) অর্ডার করতাম। ওই তো, ওই তো - পাঠভবন, নব নালন্দার মেয়েরা অটোতে বা ৪৫-এ ফিরছে বাড়ি ।
আমাদের মনে হয়েছিল আমাদেরও এরকম একটা বিকেল হবে। স্কুলের পর একসাথে বাড়ি ফেরা হবে। হল না। নো ইস্যু; কলেজে হবে। হয় নি। নিদেনপক্ষে, ইউনিভার্সিটির পর?
আমাকে তুমি বিনয় মজুমদার দিয়েছিলে –
“যুবতী ও যুবক ছিলাম
তখন কি জানতাম বুড়ো হয়ে যাব?
আশা করি বর্তমানে তোমার সন্তান নাতি ইত্যাদি হয়েছে।
আমার ঠিকানা আছে তোমার বাড়িতে ,
তোমার ঠিকানা আছে আমার বাড়িতে ,
চিঠি লিখব না ।
আমরা একত্রে আছি বইয়ের পাতায় ।”
সেই তো। সেই তো।
“আমরা দুজনে মিলে জিতে গেছি বহুদিন হলো ।”
Comments
Post a Comment