সত্যি লিখব। অন্যের সত্যি নয় ; আমার কাছে যেটুকু সত্যি, তার কথা লিখব। আমার কাছে যা গান, তাকেই গান বলে যাব। নিজের কাছে, অন্যের কাছেও। যতদিন না দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, রাতে ঘুমোতে না পারার অবস্থায় পৌঁছে যেতে হয়, গ্যালিলিওর মত না হোক, নিদেনপক্ষে শারীরিক কষ্টে বা স্বাস্থ্যহানিকর অবস্থায় না থাকতে হয়, ততদিন এই ব্যক্তিগত সত্যের সাথে কোনো আপস করা যাবেনা।
হ্যাঁ, অন্যকে অসম্মান করব না বটে, তবে কেউ তার সত্যের অবয়ব আমার ওপর চাপিয়ে দিতে হলে না কামড়ালেও ফোঁসটুকু করতে আমাকে হবেই। আমার ব্যাপ্তি সামান্য। কিন্তু, সেই সামান্যীকরণে আমার নিজস্বতা, স্বকীয়তা প্রকাশ পাবে। আমার সামনের মানুষটি জানবে, আমি নতুন কিছু বলছিনা কিন্তু যা বলছি তাই এই অস্বাভাবিক সময়ে ভুলে যাওয়া আসলে একটা স্বাভাবিকত্বের সংজ্ঞা। মানুষ কবিতা পড়ে কিছু হওয়ার জন্যে নয়, তার কাছে কবিতা ভালো - তাই সে পড়ে। অন্যদিকে কবিতা পড়ার চেয়ে একটা প্রোডাক্ট ডিজাইন করা অর্থনৈতিক দিক থেকে সময়ের অনেক যথার্থ ব্যবহার। এই দুটোই সত্যি, একই সাথে সত্যি। কিন্তু একই মানুষের কাছে, বা বলা ভালো দুটো এক মানসিক সত্তার কাছে সত্যি নয়।
একজন প্রোডাক্ট ডিজাইনার কবিতা পড়তে ভালবাসতে পারেন। তবে তখন তিনি তার প্রোডাক্ট ডিজাইনের মানসিক অবস্থান থেকে কিছুটা বেরিয়ে এসেছেন। কারণ, ফিকশন বা কবিতার আর্থিক দিক থেকে কোন রিটার্ন অন ইনভেসমেন্ট (ROI) নেই।
কেউ বলতে পারেন, তাহলে যারা বই লেখেন? সেটা বেচে তো পয়সা পাওয়া যায়। অবশ্যই। কিন্তু তেমন নামজাদা লেখক তেমন প্রকাশনা সংস্থা না হলে পরিশ্রমের তুলনায় ROI নগণ্য সারা পৃথিবীতেই। আর, বাংলার লেখক হলে তো কথাই নেই। সম্প্রতি যাদবপুরের বাংলার অধ্যাপক আব্দুল কাফি অর্ক দেবের সাথে আলোচনায় এই কথা বলেছেন যে, বই অন্যান্য পণ্যের থেকে একটু আলাদা। আর তার কারণ তার সাফল্য শুধু পণ্যটির নিজস্ব উৎকর্ষের উপর নির্ভরশীল নয় (যেমন সাবান) বরং ক্রেতার যোগ্যতার উপর অনেকটা নির্ভর করে।
কিন্তু, এই পড়া বা লেখার চর্চার পেছনে অন্য একটা ROI আছে। আর সেটাই এই চর্চার ক্ষেত্রে সত্য। মর্গান হাউসেল যেমন বলেছেন যে, বাড়ি এসে ছেলে মেয়ের সাথে সময় কাটানোর রিটার্নটা এক্সেল শীটে দেখানো যায় না, তাই 'no one is crazy'। আমি কবিতার সত্য খুঁজছি। একটা নাটক পড়ছি। তার কারণ এর বিনিময়ে যেটা পাচ্ছি সেটা খুব ব্যক্তিগত। সেটা আমার কাছে একটা যথেষ্ট রিটার্ন মনে হতে পারে। আমার কাছে মনে হতে পারে, “The time you enjoy wasting is not wasted time" । হতেই পারে অন্যের কাছে সেটার কোন মানে নেই। আর তাই দুটো পরস্পর বিরোধী স্টেটমেন্টটি একই সাথে দুটো মানুষের জন্য সত্যি হতে পারে। এমনকি একথা একই মানুষের কাছেও সত্যি হতে পারে যদি সে বিভিন্ন খন্ডিত মানসিক অবস্থানে নিজেকে ভোগ করতে পারে।
এই নিজেকে ভোগ করাটাই দুর্লভ হয়ে যাচ্ছে, আর তাই নিজের সত্যির কাছে ফিরতে হবে। অন্যকে বোঝাতে হবে যে, বিশ্বাস, সত্য - এগুলো বহুমুখী। তুমি যে, অযোধ্যার রাম রাজ্যের কথা বলছ, আমার বাংলায় তাকে আমি অন্য ভাবে দেখে বা জেনে এসেছি। তোমার দেখাটা যেমন সত্যি, আমার দেখাটাও অপাংক্তেয় নয়।
Comments
Post a Comment