Skip to main content

উস্তাদ রশিদ খান

 উস্তাদ রশিদ খান মারা যাবার খবরের পর এই লেখা মাথায় এলেও এ লেখা ওঁর মৃত্যুর সম্বন্ধে নয়। কারণ, এই মুহূর্তে ঘটে চলবে কিছু নির্লজ্জতার উৎসব। যারা গত ১০ বছরে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটিও অনুষ্ঠান সামনে বসে শুনতে যাননি, ওঁকে শোনা দূরে থাকুক, তারাও বলবেন ওঁর মৃত্যু সঙ্গীতজগতের কতটা অপূরণীয় ক্ষতি। কেউ কেউ দাবি করবেন, ওঁর গান শুনেই বড় হয়েছেন, গান চিনতে শিখেছেন। কেউ ওঁর সাথে ছবি দেবেন। কেউ কেউ‌‌ এমনকি পোস্ট করবেন testimony - রশিদ জী তাদের গান শুনে কী বলেছেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব লেখা অবান্তর। এর পেছনে নিখাদ শ্রদ্ধা নেই। আছে একরাশ - আমাকে দেখুন। আছে - আমি শুধু অ্যানিমল দেখিনা, উস্তাদ রশিদ খানকেও শুনি।

আমাদের সাথে প্রত্যেক মুহূর্তে যা যা ঘটে যাচ্ছে, আমাদের সাফল্য, ব্যর্থতা, না চাইতে পাওয়া, পেয়েও হারানো - এসব কিছুর মধ্যে মৃত্যুকেও যদি এক দৈব সম্ভাবনা বলে ধরে নিই, তাতেও এ কথার সান্ত্বনা পাওয়া যায় না যে, মৃত্যু আসবেই। আর আসবে যে কোন বয়সে। যে কোনো সময়ে। সমস্ত বাকি থাকা ছক, হিসেব করে দেবে ওলটপালট। এ জন্যই ঈশ্বর। এ জন্যই খোদাতালা। একটাই জীবন আছে ; কিন্তু যদি তা ছোট হয়ে যায়? অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে? তাই মৃত্যুর পরেও জীবন, পুনর্জন্ম- এসবের অলীক কল্পনা। এসব বিশ্বাস আমাদের সাহস দেয় যে, এখনও সময় আছে। এ জীবনে হলো না, তো কী? পরেরবার হবে।
কিন্তু সবাই একথা মানে না, আর ভাববার প্রশ্নই নেই। কারণ, মৃত্যু এই মুহূর্তে ঘটে যাওয়া সমস্ত সম্ভাবনার মধ্যে একটি হলেও অনিবার্য নয়। অভিপ্রেত তো নয়ই (?), যদি না কেউ দুরারোগ্য ব্যাধিতে দীর্ঘদিন কষ্ট পান। যদি না তার চিকিৎসার ভার বহন করতে গিয়ে তার পরিবারকে সর্বস্বান্ত হয়। যদি না তার মৃত্যুতে তার উত্তরাধিকারীরা অনেক সম্পত্তির মালিক হতে পারেন যা তাদের তৎক্ষণাৎ প্রয়োজন।
এরপরেও যে কথা থেকে যায়, তা হল, কিছু কি থেকে গেল বাকি? যে মানুষটি গেলেন, তিনি সব দিয়ে গেলেন তো? নাকি মধ্যগগনে কিছুটা না দিয়ে চলে গেলেন? অর্থাৎ, শোকটা ততটা এই কারণে নয় যে মানুষটা নেই, যতটা না এই কারণে যে, আমরা/আমাদের কিছু পাওয়া বাকি থেকে গেল না তো? মানুষটি তার ক্ষমতার সমস্তটুকু আমাদের দিয়ে গেলেন, নাকি মাঝপথে আমাদের কাছে কিছু পাওনা বাকি রেখে স্বেচ্ছায় না হলেও, দৈব সম্ভাবনায়, আমাদের একা করে দিয়ে গেলেন? এবার? আমি কি করব এবার? কার কাছে খুঁজব আশ্রয় সংশয়ে, সংকটে?
ভয়াবহভাবে পৃথিবী প্রয়োজনটুকু বোঝে। আর পৃথিবীর নিয়মে তাই স্বাভাবিক। ভালো হলেও স্বাভাবিক। ভালো না হলেও স্বাভাবিক। স্বাভাবিকত্ব এবং এই সমস্ত সম্ভাবনাপ্রবাহের মধ্যে ঘটে যাওয়া যেকোনো একটা সম্ভাবনা কোন নৈতিকতা, divine justice বা যুক্তি মেনে চলে না। আর তাই, ব্যক্তিগত জীবনের বাইরে, শৈল্পিক জীবনের সব দিয়েও কোন কোন মানুষকে দেড় মাস, দু'মাস হাসপাতালে থাকতে হয়, পাঞ্জা লড়তে হয় মৃত্যুর সাথে‌ অব্যক্ত শারীরিক যন্ত্রণা নিয়ে। সবাই ঋতুপর্ণ ঘোষের মতো ভাগ্যবান হন না। সবটুকুই সম্ভাবনা, আর আমাদের অসমাপ্ত পান্ডুলিপির শেষটুকু বোঝার নিস্ফল হাহুতাশ।

Comments

Popular posts from this blog

অনাদায়

  ১। যে আঁচেতে পুড়ে যাওয়া একটু একটু করে, সে আগুন তোমার তো নয় জানি। তবে? বসুধা কুটুমবাড়ি, অতএব পুড়ে যেতে হবে। কোথায় জ্বলছে পেট, কোথায় চাকরি, বাড়ি, যেদিকে তাকাই সবাই ছুট্টে আসে, জন্মপঞ্জি নিয়ে। মা বাবার পরিচয় চায়। ওরা বলে, দেখছ না? একই তো পেটের ফল। আর বল্‌, পাপ নিবি কি না? এই পাপ আমাদের একা করে কোন খাদে নিয়ে যাবে, এখনও জানি না।       ২। এমন করলে কেন? বুঝেছিলে মৃত্যু আসীন? এ প্রশ্নে একটি রক্তবাণ বিদ্ধ করে, সমস্ত দিন, সমস্ত রাত নির্ঘুম। দিনে রাতে পেয়াদার ডাক, আড়ং ধোলাই আসে আকাশকুসুমে, থাক থাক, আর মেরো না খোদাতালা, প্রভুর দাসেরে। বল সুবিনীত হবে? হব, তবে তোমার জন্যে এই টক্সিক উপোস-কানুন নেশা জানিনা কিচ্ছুটি, শেষ হবে কবে।     ৩। নিজের দূরাত্মীয়, সেই হল এখন প্রথমা। ভেবেছিলে সেটাই দায়িত্ববোধ। একবার হাত পাতলে সেই হাত ফিরে ফেরে, সেটা জানতে না বুঝি? বলেছিল তোমার আত্মজ। আসল আত্মীয় কে? অন্য কেউ? দুরাত্মা? জারজ?     ৪। এটুকু কিছুই নয়। ঢের বাকি আছে। সামাজিক অপমান , পুলিশ , আদালত , পাড়াছাড়া। র...

পাড়া ক্রিকেট

  নিয়ে আয় খেলোয়াড়ি বল, উড়ুক তুফানে উইকেট‌; আগেভাগে পিচটিচ ঠিক কর তোরা – আমার উদ্যানে। বাড়ির সামনে চেঁচা উত্তাল - "ভাই, ভাই ওটা পায়ে‌ লেগেছিল", ভেঙে ফ্যাল আমাদের নিশ্চুপ পাড়ার বিকেলঘুম, নিজের দিকেতে শাসানির চারটে আঙুল, আর বিরুদ্ধতার তর্জনী। আমাদের শীতকাল, বয়স বিরুদ্ধতা জুড়িয়ে উঠুক, জুড়িয়ে উঠুক সব বন্ধুতা বিচ্ছেদ, চাকরির অপলাপ এইচ-আর সালিশী সভা; আর জুড়িয়ে তুবড়ে দে, দে তো‌ দেখি, হিংসুটে দৈত্যের বাগানেতে অপ্রতিম কাঁটাগাছ, আর ভেতরেতে নুয়ে পড়া করুণ জবা। মধ্যবয়সে যারা বুড়ো ভাম, ভীমরতি প্রাপ্তির সামান্য দূরে – এটুকু মানতে পারি, আমাদের বাপ, মা, কাকারাই পাড়ায় পাড়ায় আদরে, বেনামে, কালো টাকা আর সবুজ উদ্যানে, ফেলেছে সিন্ডিকেট, নির্মিয়মাণ ফ্ল্যাট, ফণীমনসার কাঁটা বেড়ার স্তবক। এখন বিকেল হল। আমার পাড়াকে তোরা টেনে আন উদ্যানে। আমাদের আওয়াজের ভদ্রতা ভয়টুকু ব্যাটেতে, বলেতে নাচা- "আউট, আউট"। শেখা ঢের বাকি আছে নীতি বা সবক। ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

সুসংবাদ, এসো

সুসংবাদ আর আসেনা  আর সত্যিই আসেনা আমার এই দিনানুদিনে। অতএব, আমি তো সত্যিই এই ঝাকানাকা অতীতবিলাসটুকু ভাঙিয়ে খাই‌। আর মেয়ে পটাতে গিয়ে বলি, মাত্র পনেরোতে,  মানে তাও তো পনেরো হল, সুনীল গাঙ্গুলী আমাকে একদিন পিছলে পড়ে স্কচ খাইয়ে, নাকি কৃত্তিবাসে কবিতা ছাপিয়ে দেবে বলেছিল। হেঁ, হেঁ... কেউ কথা রাখেনি। কেউ কি রাখে? তাও তো হাফে... হাফ হাতা, শালা,  হাঁটুর বয়সে... খুশি। খুশি, মেড়ো মাল  নতুন বাংলা লিখা শিখেছে হাঁটুর বয়সে,  এই তো ইদ্রিস ওর হাঁটুর বয়সে, ব্যথা, বিয়ে হবে ওদের।  প্রজাপত্য। আর লেখা ছাপা হবে আনন্দ...আনন্দ, দেশ, আমাদের দেজ... এসো, সীমাহীন সুসংবাদ, এসো সুসংবাদ, এসো! ১৮ এপ্রিল,‌ ২০২৬