প্রতিপদে সে এসেছিল। সুখবর। একা আসে নি। অনেক অন্য সুখবর নিয়ে এসেছিল। যে বন্ধুরা সারা বছর একটু হিসেবী, তারাই এখন বেহিসেবী হয়ে যায়। বলে, চল্, তোকে অনেকদিন কোথাও খাওয়ানো হয় না। তারপর আমরা লাইন দিই কলকাতার সেরা এক বাঙালী রেস্তোরাঁয়। দেখতে থাকি, আমাদের কলেজ লাইফের ঝারিশিল্পীত প্রতিমাদের শাড়িতে।
আমাদের বা তার পরবর্তী প্রজন্মের বাঙালী মেয়েদের, বিশেষ করে তিরিশের নীচের মেয়েদের, কেন জানি না, কোনোদিনই আমার শাড়িতে পছন্দ নয়। মনে হয়, সেই ম্যাকবেথের ‘মিসফিট গারমেন্টস’-এর মত এও তাদের মা, কাকিমা, বা অন্য কেউ জোর করে পরিয়ে দিয়েছে। শাড়ি তাদের এঁচোড়ে পাকা করে দিচ্ছে বাইরে, কিন্তু তারা কিছুতেই শাড়ির আভিজাত্যের মাপে উঠতে পারছে না।
এখনও তাই। শাড়ি পরে তাই তাদের পোজ দেওয়ার থেকে চোখ সরিয়ে নিই, যেমন এত বছর সরিয়ে নিয়েছি।
আমার নীরা, বেলা বোস, বা বনলতা সেনকে কি আমার আশপাশের কলকাতা আর তাদের ইন্সটা রিলে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার তাগিদ এভাবে ওয়ানা-বি বা একজন কুচুটে লেডি ম্যাকবেথ করে দেবে?
সে বাস্তবে এত কম আকর্ষণীয় কেন?
তার বমির রং হলদে কেন?
কেন তাকেও হুইলচেয়ার নিতে হবে?
এসবের থেকে পুজোর আমি বা আমরা অনেক আলাদা। সে কদিন আমরাই একটা চলমান সুখবরের ভ্যান, নিজের জন্য বা অন্যদের জন্য। আমরা বেশিক্ষণ লাইনে দাঁড়াই নি। এদের পোজ শেষ হওয়ার মিনিট পাঁচের মধ্যেই শুরু করেছি প্রতিপদের মহাভোজ থালির অর্ডার।
মনে পড়ছিল, এরকম কোনো এক উৎসবের দুপুরবেলা, সম্ভবত বিশ্বকর্মা পুজো বা কিছু একটা ছিল, বেশ মেঘ মেঘ করেছিল। আর মেঘ মানেই আমার কাছে আক্ষরিকভাবেই ডিপ্রেশন। আমি সোফায় শুয়ে আমার এক ব্যাঙ্গালোরবাসী দাদাকে হোয়াটসআপে বলছিলাম যে, রান্না করতে ইচ্ছে করছে না কিন্তু আজ একটু খিচুড়ি হলে মন্দ হয় না।
সে বলল, করিস না।
তাহলে?
অপেক্ষা কর।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই আমার কাছে এস এম এস। তিনি সুইগি দিয়ে জম্পেশ খিচুড়ি, বেগুন আর পাঁপড়ভাজা পাঠিয়ে দিচ্ছেন আমারই যাদবপুরের প্রিয় বাঙালী খাবার দোকান থেকে।
কাল দুপুরেই বাঘাযতীন স্টেশনে খুঁজছিলাম প্রতিদিনের রোববার পাব্বনি-র সংখ্যা। পেলাম না। যাদবপুর চলে গেলাম। একটা স্টেশন। নাহ, অদ্ভুত। সেখানেও নেই। বাড়ি ফিরে এক এক্স কলিগকে ফোন করেছিলাম এই নিয়ে সামান্য দুঃখ করতে। তার বিকেলে আমার বাড়ি আসার কথা।
কিন্তু, ওই যে। সুখবর, সুখবর। বাতাসে সুখবর অনেক সুখবর নিয়ে আসছে। ভাস্কর চক্রবর্তী বেঁচে থাকলে এসব সুসংবাদ পেতেন? এক ঝটকায় সে বলল, দাঁড়াও। বাবা স্নানের পর একটু বাইরে বেরোয়। দেখছি।
আর ঘন্টা খানেই পরেই তার আবার ফোন – হয়ে গেছে। একটাই পড়েছিল পাড়ার দোকানে। বিকেলে নিয়ে আসব।
এসব সকালে চাঁদা নিয়ে কোনো অতিরিক্ত কথা হয় না। হয় নি। তাঁরাও এসেছিলেন। চুপচাপ নিয়ে গেছেন। বলেছেন, অষ্টমীতে বসে খাওয়ানোর ব্যবস্থা হচ্ছে প্রতি বছরের মত, এবারও। সবাইকে নিয়ে আসবেন কিন্তু।
পুজো আসছে। আর আমার মনে হচ্ছে, এবছর বৃষ্টি কম হবে। আকাশ অংশত মেঘলা থাকলেও আমরা বেশ করে ঘুরতে যাব। বেশ খাব। একটু পেট খারাপ, মন খারাপ কম হবে।
এসো প্রতিপদ। প্রতি পদে যেসব বাধা দিয়ে যাচ্ছিলে, সে সব এবার নস্যাৎ করে দিচ্ছ, তাই তো?
‘এসো সুসংবাদ, এসো।‘
১২ অক্টোবর, ২০২৬
Comments
Post a Comment