এই যে হঠাৎ এক অকল্পনীয় ভালো লাগা ছড়িয়ে যাচ্ছে বাতাসের আদরে আদরে, এসবকে নষ্ট করে দিতে ওরা আসবে। অনেক কিছুই আসবে। অফিস থেকে ফোন আসবে, বলবে এক্ষুনি লগ ইন করা দরকার, কারণ এক জরুরি রিসোর্স আজ শিফটে ডুব মেরেছে। না চাইতেই কোথাও বেজে উঠবে অ্যাম্বুলেন্সের হুটার আর মনে করিয়ে দেবে, পুজো সবার জন্য নয়। রাস্তায় ভিড় ঠেলে যখন ভেতরে বসে থাকা লোকগুলো ভাববেন মানুষ এমন অমানুষ হয়ে যাচ্ছে কেন যে অ্যাম্বুলেন্সকেও রাস্তা ছাড়তে চায় না, হাসপাতালে সময়ে পৌঁছানো যাবে তো, তখনই কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্যান্ডেলের উদ্যোক্তারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাঁদের ভিআইপি গেট, ভিভিআইপি গেটের ব্যারিকেড খুলে দিয়ে বলবেন— "এদিক দিয়ে যান, তাড়াতাড়ি!"
আমাদের পুজো আসলে বিভিন্ন মুহূর্ত নির্মাণের পুজো। একটা নোংরা আমি, একটা খারাপ আর কোরাপ্ট আমি রাতারাতি ভালো হয়ে যাবে, তা তো হয় না। কিন্তু একটু এদিক-ওদিক তাকালেই দেখা যাবে, পুজোয় সমস্ত মুহূর্ত ঠিক রিলস বানিয়ে ধরার নয়। কারণ সেটা করলে, হয় সে মুহূর্তটা খাটো হয়ে যাবে, কিংবা রিলটা ততটা দেখতে ভালো লাগবে না। এই মুহূর্তগুলো এতটাই কম সিনেমাটিক, এতটাই সাধারণের থেকেও সাধারণ। আর সেটাই একটু ভালো আমি।
আমি যে আজ গড়িয়াহাট আদর্শ হিন্দু হোটেলে খেতে খেতে ভাবছিলাম, সামান্য খাবারকে কী শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে অসামান্য করে তুলতে পারেন এঁরা, হয়তো দামটা একটু বেশি পড়ে কিন্তু পুজোর জন্য সেটা করিই না হয়? এসব কথা কি আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত নয়? আজ থেকে দশ বছর, কুড়ি বছর পরে গড়িয়াহাটে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ যখন এই কথাটা মনে পড়বে বা এরকম আরও অথেন্টিক কত মুহূর্তের কথা আমরা ভুলে যাই, কিন্ত ঝলকে একটা স্মৃতি আশ্চর্য রঙিন হয়ে ওঠে— সে কথা আমি কাকে বলি? আর সবচেয়ে বড় কথা, রিলস বানিয়ে কীভাবে বলি? আজ দেশপ্রিয় পার্কের ভিড়ে প্যান্ডেলে ঢুকতে গিয়ে এক যুগলের হাতে ধরা হাতকে ভেঙে দিয়ে সামনে এগোতে হয়েছে। এসব অভিশাপের কথা সামান্য শর্টসে তুলে হাসির খোরাক করে দেব?
ক্লান্ত হয়ে গেছি। টানা সাড়ে তিন ঘণ্টা হাঁটা এবং রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঠাকুর। একটু পা-কে এবং গা-কে আরাম দিতে ইন্ডথালিয়াতে বসে একটা জিনজার সোডা। এখানেই আমরা একসময় আসতাম। তখন একটা কফি পাওয়া যেত, নাম কফি কিস। সাথে আমরা নিতাম গার্লিক চিকেন সসেজ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা। কই, পুজো-অপুজোর সেই গল্পগুলোকে তো আমরা এমনভাবে ডকুমেন্টেড করে রাখিনি, যাতে সেটা শুধু ফেসবুকে তোলা থাকে, কিছু লাইক-কমেন্ট পড়ে, কিন্তু আমাদের আর কোনোদিনই দেখা হয় না?
আমাদের রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ে সপ্তমীর মুহূর্ত নির্মাণগুলো আসলে ওই ঠাকুর দেখার ভিড়ে। এক-একটা ভিড় ঠেলে ঠাকুর দেখা হয়ে যাওয়ার পর মনে করায় যে একটা বেশ বড় অ্যাচিভমেন্ট হলো। তারপর বাইরে রোল, কোল্ড ড্রিংক। কখনো ক্যাম্পারি থেকে ফিশ ফ্রাই। বেদুইনে ঘণ্টাখানেক লাইন, তারপরে যথেষ্ট ভালো একটা মিক্সড ফ্রাইড রাইস আর চিকেন ইন অয়েস্টার সস। নিউ চায়না টাউন রেস্টুরেন্টে প্রথম পর্ক সহযোগে ক্যান্টনিজ নুডুলস খাওয়া।
আজও কেন মনে হয় এই রাসবিহারী অ্যাভিনিউ ধরে হেঁটে না গেলে সপ্তমী ঠাকুর দেখা এবার পুজোতে অসমাপ্ত থেকে গেল? তার একটা কারণ ২০০৭-০৮-এর ওই সকালবেলাগুলো। সেইসব মুহূর্ত নির্মাণের সকালবেলা। সেইসব অসমাপ্ত মুহূর্তকে বছরের পর বছর স্তরে স্তরে অন্যভাবে নির্মাণের সকালবেলা।
১৭ অক্টোবর,২০২৬
Comments
Post a Comment