বিকেল হলেই পাড়ায় আলো জ্বলে ওঠে। ঝকঝকে হতে থাকে অপরিচ্ছন্ন চপের দোকানগুলো আর দোকানীদের চোখ। এর পাশাপাশি যাদের আর্থিক ক্ষমতা আরেকটু বেশি, সেইসব রোল, চাউমিনের দোকানে আমরা কেউ কেউ যাই। পুজো মানেই বাজার; আর্থিক শ্রেণী বিভাজন আরেকটু স্পষ্ট ঠিকই, কিন্তু অর্থনীতি চাঙ্গা। লম্বা খেলা বাকি আছে পুজোর দিনগুলোয়। আর সপ্তাহ তো কেবল শুরু। এসব ভেবে পেটকে সামান্য আরাম দিই। মিক্সড ক্যান্টনিজ্ নুডলস্। কিন্তু, আমার সাথের জন এত অল্পে খুশি নয়। সে বলে, সাথে একটু ড্রাই চিলি চিকেন হবে না? হোক, আমি একটা বা দুটো ম্যাক্স। তার বেশি কিন্তু নয়। পানাহার পর্ব এ সপ্তাহে মারাত্মক। আমি তাই আরেকটু সমঝে চলব। কিন্তু, সে সেখানেই থামে না। প্রথমে, এখন একটু ফিস ফিঙ্গার বা পকোড়া হয়ে যাক?
কী যে হয়! পুজো এলে আমাদের কেন যে এত বেখেয়াল আর বেহিসেব চেপে বসে!
তবে, ফিস ফিঙ্গার শেষ হয়ে গেছে। পকোড়াও। অতএব, আমাদের একটু এগিয়ে যেতে হয় ওই ভাজাভুজির দোকানগুলোর দিকে। তারপর ঠোঙা ভরে ফিরি।
দ্বিতীয়া আর একাদশী, দ্বাদশীর বিকেল-সন্ধ্যেগুলো বাইরে দেখতে একরকম। প্যান্ডেলগুলো প্রতিমাবিহীন। কাঠ, বাঁশ অর্ধনগ্ন। এইমাত্র যেন তাদের আব্রুহরণ হয়েছে। কিন্তু, আসল পার্থক্য অন্য কোথাও। দ্বিতীয়ার বিকেল মনকেমনের নয়। আব্রু এখনও হৃত নয়, বরং তাদের আরো আবৃত করা বাকি। প্যান্ডেলগুলো জৌলুসহীন নয় মোটেই। বরং, জৌলুসের আলোর জন্য অপেক্ষমাণ।
আমরা সেইসব হয়ে ওঠা প্যান্ডেলগুলো একটু ঘুরে ঘুরে দেখি এ পাড়া ও পাড়া। আর আমাদের ধীরে ধীরে মনে হয়, পুজোর গন্ধ বা ভাইব, এটাকে পেতে হয়। ডুমস্ক্রোলিং করে গেলে সেসব না পাওয়াই স্বাভাবিক। আমাদের ছোটবেলা থেকে বড় হয়ে ওঠার ইতিহাস মাথায় রেখে কিছু অভ্যেসকে সযত্নে আগলে রাখতে হয় যাতে আমাদের অলক্ষ্যেই সিলিকন ভ্যালির কর্মকর্তারা আমাদের আমি-টাকে বদলে না দিতে পারে। সে জন্যই পুজোর মধ্যে আবশ্যিকভাবে রোল,চিকেন ড্রামস্টিক আর কোকের কাছে ফিরে যাওয়া। সে জন্যই নাক খুঁজে ফিরবে ছাতিমের গন্ধ। সে জন্যই পুজোর কদিন নন্দনচত্বর ভীষণ একা হয়ে যাবে। লোকে খুঁজে নেবে উত্তরে হাওয়ার আবদার।
আর, আমরা যারা এখনও কলোনিয়াল হ্যাংওভার কাটাতে পারি নি, তাদের দ্বিতীয়ার সকালে মনে হবে, আজ মধ্য কোলকাতার এক পাবে একটা মজাদার ইভেন্ট আছে। সেখানে তোমাকে নিয়ে যাব। ডক্টর রোসিঙ্কা চৌধুরী ১৯শতক ও বাঙালীর ড্রয়িংরুমের বিবর্তন নিয়ে কিছু কথা বলবেন আজ। তবে ক্লাসে নয়। চৌরঙ্গীর এক পাবে।
হাতে একটা বিয়ার নিয়ে আমরা সাহেবীয়ানার আর বাঙ্গালীয়ানার গপ্পো শুনব। তাতে পুজো কিছুটা পেছনে সরে যাবে ঠিকই। কিন্তু, এই যে পুজো এলেই আমি আরো প্রবলভাবে ভালো আমি হয়ে উঠতে চাই, সেটা হয়তো করা যাবে।
১৩ অক্টোবর, ২০২৬
Comments
Post a Comment