খুব ভালো থাকতে নেই। তাতে ভালো থাকাটা চলে গেলে, অবশ্যম্ভাবী ভাবে স্বাভাবিক থাকাটা বোঝা বলে মনে হয়। অনেকেই বলেন, অ্যালকোহল নেওয়ার পরে পরের দিন হ্যাংওভার থাক বা না থাক, সকালে বেশ মন খারাপ লাগে। কেন হয়? খুব স্বাভাবিক হরমোন ঘটিত কারণে। সহজে পেয়ে যাওয়া ডোপামিন আমাদের আনন্দকে যেমন তুঙ্গে নিয়ে যায়, তেমন তার জোগান শেষ হলে চারপাশটা যতটা বেরঙিন, তার চেয়ে অনেক বেশি বেশি খালি খালি লাগে।
আজ দশমী। সকালে ঘুরে এসেছি মুদিয়ালি, শিবমন্দিরের মত ওদিকের কিছু পুজো। লোকগান, বাদ্য, নৃত্য আমার তেমন ভালো লাগেনা। তবে মুদিয়ালি মণ্ডপের বাইরে ধামসার তালবাদ্য শুনে থমকে গিয়েছিলাম মিনিট পাঁচেক। সন্ধ্যেবেলা আবার বেরিয়েছিলাম। আমারই বাড়ির তিন-চার কিলোমিটারের মধ্যে কিছু পুজো হেঁটে দেখব বলে। সে সব হল। চিকেন মোমো খাওয়া হল। খাওয়া হল উৎকৃষ্ট মানের দার্জিলিং চা কাঁচের স্বচ্ছ কাপে।
কিন্তু, তারপরেই হল বিপদ। এই সন্ধ্যেয় বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় যেটা মনে হয়নি, এবার সেটা আস্তে আস্তে মনে হতে শুরু হল। আলো ক্রমে নিভে আসছে। শব্দেরও তীব্রতা ততটা আছে কি? আমি জানি, এক ঘন্টায় হঠাৎ সব বদলে যায় না। আমারই দেখার ভুল, ভাবার ভুল। কিন্তু ভুলটা মেনে নিতে পারলেও মনে নিতে পারছি কই? ডোপামিন ক্র্যাশ ভয়ানক জিনিস। অন্যবার পুজো এত ভরাট করে কাটানো হয় না। এবার হয়েছে। আমি আমার স্বাভাবিকত্বের সীমা লঙ্ঘন করে বলেছি, আই ডিসার্ভ বেটার। আর দুর্গাপুজোর দৈব সহায় প্রতি মুহূর্তে আমাকে সেটা করিয়ে দিয়েছে। কোন পাপবোধ ছাড়াই আমার প্রত্যেক মুহূর্তে মনে হয়েছে, এই যে একটা কথা প্রচলিত হয়েছে যে, এ বছর দুর্গা পুজোতে ঠিক পুজো-পুজো মনে হচ্ছে না, বা ব্যবসায়ীরা মার খাচ্ছে, এবং রাস্তায় ভিড় কম, ইত্যাদি ইত্যাদি, এসব সত্যি হতে পারে, কিন্তু তা নির্ঘাত আমার সত্যি নয়। আমি আমার দেখাটুকুর কথা বলতে পারি। সেখানে এবছর দুর্গাপুজার কোনো খামতি নেই।
এসব ভাবতে ভাবতেই বাড়ি ফিরছিলাম। আর মনে হচ্ছিল, আরও ঢাক বাজুক। আরেকটু জোরে বাজুক। হৃদযন্ত্রের রোগীদের কানে বাজুক আবাহনের শাঁখ বা বিসমিল্লার পাগলা সানাই। এখন চালা খুলে নেওয়ার সময়। এখন প্যাণ্ডেল একটু একটু করে নগ্ন হবে, প্রতিমা হয়ে যাবে বেআব্রু, লুণ্ঠিত। এত শ্রদ্ধা, আদর, আর আকুতির পর তিনি সেটা ডিসার্ভ করেন না। আমরাও করি না। একেকটা কাজে আমাদের সমস্ত দিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার পর, লুণ্ঠিত হয়ে যাওয়া আমরা ডিজার্ভ করি না। আমাদের সংস্কৃতি সহাবস্থানের সংস্কৃতি। বিতর্কের ও আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি। আমাদের সংস্কৃতি নস্টালজিয়াকে মেনে নিয়ে আধুনিকতাকে আলিঙ্গনের সংস্কৃতি। আমাদের সংস্কৃতি ধর্মনিরপেক্ষ থেকে সমস্ত ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার সংস্কৃতি, এবং সর্বোপরি সেই ধর্মের উৎসবের নির্যাসটুকু নিয়ে তাকে জাতি-ধর্ম-মতের বাইরে গিয়ে উদযাপনের সংস্কৃতি।
সেখানে গিয়ে কে কী খাচ্ছেন, কে কী পড়ছেন, কে কী বলছেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেটা বৌদ্ধিক তর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই জন্যই, তার খাওয়া, পড়া এবং বলার স্বাধীনতাকে স্বীকার করা আরো বেশি জরুরী।
মতান্তরে মনান্তর হবেই। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যা স্বাভাবিক বা যা প্রবণতা, তাকে প্রশ্ন করতে করতেই আমরা আরেকটু ভালো আমি হয়ে উঠি। সেই ভালো আমি-কেই আমরা পুজোর দিনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকতে চেয়েছিলাম। সারা বছর পারব না। কিন্তু দেখা যাক। অন্তত লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজো, ভাইফোঁটা হয়ে জগদ্ধাত্রী পুজো পর্যন্ত পারলেও তো সেটা অনেক বড় পেরে ওঠা। অল্প নিয়েই থাকি না হয়?
বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা সবাইকে। খুব ভালো থাকুন। ভালো রাখুন।
২১ অক্টোবর, ২০২৬
Comments
Post a Comment