Skip to main content

চতুর্থী

 "চতুর্থী সর্টেড" করে দেওয়ার অবশ্য একটা সোজা উপায় আমাদের অনেকের জানা আছে। জয় বাবা ফেলুনাথ দেখে ফেলা। “পরশু তো ষষ্ঠী…” ইত্যাদি ইত্যাদি। আমিও সেটা প্রতিবারই রিচুয়ালের মত করি। এবারও করব।

তবে বিকেলে কফির পর।
আজ দুপুরে আরেকটা সিনেমা দেখব। সেটা একেবারে অন্যরকম – ক্লোয়ে ইন দ্য আফটারনুন, এরিক হ্রোমারের সিনেমা।
কেন?
পুজো ঠিক এসে পড়ার আগে আমি ঠিক একটা দিন বেছে নিই, যেটা আমার নিজস্ব দিন। যেদিন আমার ‘কোথাও যাওয়ার নেই, কিচ্ছু করার নেই’। এই সিনেমাটা যখন শুরু হয়, তখন আপাতত ফ্রেদেরিককে, মানে মূল চরিত্র যে, খানিকটা সেরকমই লেগেছিল আমার। ফ্রেদেরিক বড় শহরকে ভালোবাসে। পারী তার বেশ পছন্দের। এখানে সে বহুজনতার মাঝে অপূর্ব একা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। এ শহরে কেউ বুড়িয়ে যায় না। তাকে কারও সাথে জোর করে মিশে যেতে হয় না। কিন্তু সেটাই তাকে ঠিক একাও থাকতে দেয়না। ফ্রেদেরিক একজন ফ্ল্যানর (flâneur) ঠিকই কিন্তু তাকে ঠিক উদ্দ্যেশ্যহীন ফ্ল্যানর বলা যাবে না। আসলে পারীর রাস্তাঘাট, ক্যাফে, পথচারী, সব কিছু বিবাহিত ফ্রেদেরিকের কাজে এক অভূতপূর্ব সুযোগের খনির মত কাজ করে – তার স্ত্রী, উচ্চবিত্তীয় জীবিকা এইসব ছেড়ে না পালিয়েও সে একজন অনন্য সাধারণ হয়ে থাকতে পারে, থাকতে চায় এই শহরের ক্যাফেতে, রাস্তায়।
এ কি আমারও কথা নয়? বাইরেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে দেখা কি আমাকেও এই মুক্তি দেয় না? কিন্তু আমার বা ফ্রেদেরিকের এই চরিত্র হয়ে ওঠার পেছনে কি আমাদের অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের গ্লানিও কোথাও লেগে নেই? আছে তো। ফ্রেদেরিকের আছে? কী জানি। আমার? হ্যাঁ। আছে।
আসলে, চতুর্থী দুপুর হলেই মনে হয়, কাল থেকে তো পুজোর জন্য এখানে ওখানে দৌড়, সিনেমা দেখা, পানাহার শুরু। আজ একটু গা-এলানো দুপুর কেটে যাক? সময় থেকে বিচ্ছিন্ন দুপুর? এই সিনেমাতে ফ্রেদেরিক আর ক্লো তাই সময়কে খানিক আটকে দিয়ে বারবার দুপুরে দেখা করে। তাতে তার দৈনন্দিনতাকে, দুনিয়াদারিকে খানেক সরিয়ে রাখা যায়। সে তার জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ, বদল-আনা সিদ্ধান্তকে আপাতত পিছিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু, আসলে এই পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটাও অজান্তেই শেষমেশ তার নিজেরই সিদ্ধান্ত । সে আসলে পুজোয় কটা দিনের স্বপ্নের সেই‘আমি’-টা, যে অনেক রঙিন, অনেক নিজের মনের কাছাকাছি। সে বাস্তবে কোনোদিনই সেরকম হতে পারবে না। তবে তাতে কী বা এসে যায়? এই দুপুরে না হয় খানিকটা ওরা নিজের মত থাকুক? ওদের আমরা ঘুরতে দিই পারীর প্রমোদ আড্ডায়? আমি ওদেরকে না হয় একটু দূর থেকে দেখি? সুন্দরের বেশি কাছে যেতে নেই যে, নীরেন চক্রবর্তী শিখিয়ে গেছেন।
“জয় বাবা ফেলুনাথ” দেখতে বসলে কিন্তু আমার একটা গোলমাল হয়। আমি এই সিনেমাকে কোনোদিনই নির্ভেজাল একটা পুজোর সিনেমা, গোয়েন্দা গল্প বা জটায়ুর কমিক মোমেন্টের অসাধারণত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারি না। ঋতুদা-র “উৎসব” যেমন আসলে উৎসব পেরিয়ে পারিবারিক বিভাজনের বা ভাঙ্গনের একটা সিনেমা, আমার কাছে তেমনই "জয় বাবা ফেলুনাথ" আসলে “সোনার কেল্লা”-র থেকে অনেক এগিয়ে থাকা একটা কাজ এবং একটা ভীষণই ডার্ক সিনেমা। সিনেমার নির্মাণেও সত্যজিৎ রায় তার ছাপ রেখে গেছেন। একটা দৃশ্যের উদাহরণ দিই।
উমানাথবাবুকে তাঁর বাবা নিজের ঘরে ডেকেছেন; বলছেন, "মিত্তিরকে একটা কথা বলিনি আমি, কারণ সেটা বলা যায়না। তোমাকে বলছি।" আলো ফিরে ফিরে আসছে তাঁর মুখে। ওই টেনশনটা, ওই স্বগত মুহূর্তটা, দেখুন আর ভাবুন, একজন বাবা কীভাবে তার ছেলের সাথে কথা বলছেন যখন তিনি ভেতরে ভেতরে গুম মেরে যান ।
"সেদিন আমার ঘরে লোক ঢুকতে না দেখলেও, লোককে বেরোতে দেখেছিলাম। সে লোক ছিল ভদ্রলোক।" আমরাও ভদ্রতা সামলাচ্ছি, তাই তো? মনে পড়ে? মনে পড়ে কোন আত্মিক মুহূর্তে? সিনেমাটা আরেকবার দেখলে মন দিয়ে লক্ষ্য করবেন ওই দৃশ্যের আলো আর শব্দ। সম্পূর্ণ থমথমে।
এখানে উমানাথবাবুর বাবা কিন্তু জানেন যে, তাঁর গণেশ চুরি হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু, তিনি তো বিব্রত অন্য কারণে। মানুষের মনটাকে নিয়ে তাঁর চিন্তা – “যার মনে চুরি, সেই তো চোর।“ কিন্তু, সে কে?
এই সিনেমা বারবার দেখতে গিয়ে আমার রুকুর জন্য খুব মন খারাপ হয়েছে। ছোটদের নিজের একটা জগত থাকে ঠিকই, কিন্তু বনেদী বাড়ির রুকুর সাথে, যে কোন কারণেই হোক, তার বাবা-মায়ের একটা দূরত্ব আছে বলে আমার মনে হয়েছে। তার গল্পের আশ্রয় শশীবাবু। তার ফ্যান্টাসির জগতের অ্যাসিসটেন্ট র‍্যাক্সিট কিন্তু অন্য কেউ নয়, বরং তার দাদু নিজেই। আর সেই জগতে নিজেকে খানিক আলাদা করতে সে পুজোর দিনেও সময় কাটায় চিলেকোঠার ঘরে, বাবার কাছে বকা খেয়ে। সেই ঘরটাই রুকুর পৃথিবী, যেমন রবীন্দ্রনাথের পৃথিবী ছিল তাঁর জানালা আর ছাদ। কিন্তু, জীবনস্মৃতির ভৃত্যরাজক তন্ত্রে বেড়ে ওঠা রবীন্দ্রনাথের একাকীত্বের, মা-বাবার সাথে (বাবার সাথে পরে অবশ্য দূরত্ব ছিল না) দূরত্বের কারণ ছিল অন্য। তাঁরা অনেক সন্তান। কিন্তু, রুকুর ক্ষেত্রে তো তা নয়।
রুকুর মতো ছেলের শৈশব কারও না হয়, সেটাই বোধহয় কাম্য।
ফ্রেদেরিকের ফ্যান্টাসির জানালা আছে, যাওয়ার পথ আছে। সে যায় না। কিন্তু, যেতে পারে। সেই সম্ভাবনার পথও সে খুলে রেখেছে। রুকু সেই একই বুর্জোয়া সংস্কৃতির ছেলে, হতে পারে একটু শেষের দিকের, যখন উমানাথ বাবুর ব্যবসার অবস্থা ভালো নয়। কিন্তু, ফ্রেদেরিকের নানা সম্ভাবনার মধ্যে বেছে নেওয়ার পথটুকু রুকুর নেই। বাড়িতে পুজো চললেও সে আটকে আছে চিলেকোঠায়। তার স্বর্গ আর স্যারিডন নেই। থ্যাঙ্কস টু ক্ষিরীশ চাকলাদার, তার শুধু ক্যাপ্টেন স্পার্ক আছে।
১৪ অক্টোবর, ২০২৬

Comments

Popular posts from this blog

অনাদায়

  ১। যে আঁচেতে পুড়ে যাওয়া একটু একটু করে, সে আগুন তোমার তো নয় জানি। তবে? বসুধা কুটুমবাড়ি, অতএব পুড়ে যেতে হবে। কোথায় জ্বলছে পেট, কোথায় চাকরি, বাড়ি, যেদিকে তাকাই সবাই ছুট্টে আসে, জন্মপঞ্জি নিয়ে। মা বাবার পরিচয় চায়। ওরা বলে, দেখছ না? একই তো পেটের ফল। আর বল্‌, পাপ নিবি কি না? এই পাপ আমাদের একা করে কোন খাদে নিয়ে যাবে, এখনও জানি না।       ২। এমন করলে কেন? বুঝেছিলে মৃত্যু আসীন? এ প্রশ্নে একটি রক্তবাণ বিদ্ধ করে, সমস্ত দিন, সমস্ত রাত নির্ঘুম। দিনে রাতে পেয়াদার ডাক, আড়ং ধোলাই আসে আকাশকুসুমে, থাক থাক, আর মেরো না খোদাতালা, প্রভুর দাসেরে। বল সুবিনীত হবে? হব, তবে তোমার জন্যে এই টক্সিক উপোস-কানুন নেশা জানিনা কিচ্ছুটি, শেষ হবে কবে।     ৩। নিজের দূরাত্মীয়, সেই হল এখন প্রথমা। ভেবেছিলে সেটাই দায়িত্ববোধ। একবার হাত পাতলে সেই হাত ফিরে ফেরে, সেটা জানতে না বুঝি? বলেছিল তোমার আত্মজ। আসল আত্মীয় কে? অন্য কেউ? দুরাত্মা? জারজ?     ৪। এটুকু কিছুই নয়। ঢের বাকি আছে। সামাজিক অপমান , পুলিশ , আদালত , পাড়াছাড়া। র...

পাড়া ক্রিকেট

  নিয়ে আয় খেলোয়াড়ি বল, উড়ুক তুফানে উইকেট‌; আগেভাগে পিচটিচ ঠিক কর তোরা – আমার উদ্যানে। বাড়ির সামনে চেঁচা উত্তাল - "ভাই, ভাই ওটা পায়ে‌ লেগেছিল", ভেঙে ফ্যাল আমাদের নিশ্চুপ পাড়ার বিকেলঘুম, নিজের দিকেতে শাসানির চারটে আঙুল, আর বিরুদ্ধতার তর্জনী। আমাদের শীতকাল, বয়স বিরুদ্ধতা জুড়িয়ে উঠুক, জুড়িয়ে উঠুক সব বন্ধুতা বিচ্ছেদ, চাকরির অপলাপ এইচ-আর সালিশী সভা; আর জুড়িয়ে তুবড়ে দে, দে তো‌ দেখি, হিংসুটে দৈত্যের বাগানেতে অপ্রতিম কাঁটাগাছ, আর ভেতরেতে নুয়ে পড়া করুণ জবা। মধ্যবয়সে যারা বুড়ো ভাম, ভীমরতি প্রাপ্তির সামান্য দূরে – এটুকু মানতে পারি, আমাদের বাপ, মা, কাকারাই পাড়ায় পাড়ায় আদরে, বেনামে, কালো টাকা আর সবুজ উদ্যানে, ফেলেছে সিন্ডিকেট, নির্মিয়মাণ ফ্ল্যাট, ফণীমনসার কাঁটা বেড়ার স্তবক। এখন বিকেল হল। আমার পাড়াকে তোরা টেনে আন উদ্যানে। আমাদের আওয়াজের ভদ্রতা ভয়টুকু ব্যাটেতে, বলেতে নাচা- "আউট, আউট"। শেখা ঢের বাকি আছে নীতি বা সবক। ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

বাগানবিলাস

  তোমার সমস্ত উত্তরের সামনে নিশ্চুপ হয়ে বসি। এই দেখেছ বাগানে নিম তুলসি এই দেখো না মৌটুসী মেনে নেয় কেমন ফুলকপির ডাঁটে গড়ে ওঠে নিস্তব্ধ জবা। তোমার খোলা বুকের ফোঁটার দিকে তাকিয়ে থাকি আর মনে হয় এবছর শেয়ারবাজারে সারের ফলন হবে ভালো।