পঞ্চমীতে এক একটা প্যাণ্ডেল হেঁটে পেরিয়ে যাচ্ছি, আর যথারীতি, গান আমায় ডুবিয়ে দিচ্ছে আদ্যোপান্ত নির্লজ্জ নস্টালজিয়ায়। "তোমায় পড়েছে মনে আবার শ্রাবণ দিনে" – পুজোয় কিশোর কুমার গেয়ে চলেছেন। পুজোয় শ্রাবণ দিন? কেন?
কেনই বা হবে না?
বৃষ্টি তো এবার পিছু ছাড়ছেই না। কলকাতায় কাল দুপুরে ছিটেফোঁটা বৃষ্টি হয়েছে, আর আজও। "একলা বসে নিরালায়"? সেটাও খানিক সত্যি, জানো? বেশ কয়েক বছর ধরেই শুরু হয়েছে পুজোতে নিরালায় না থাকার এক অভূতপূর্ব উপায়। তুমি তোমার পছন্দের ছেলে বা মেয়ে বন্ধু 'ভাড়া' করতে পার। ব্যাস্। আর 'একলা বসে নিরালায়' থাকার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু এসব করে তোমাকে মনে পড়া আটকানো যাবে কি?
কথাটা তো সেটাই। পঞ্চমী দুপুরে যোধপুর পার্ক, সেলিমপুর, বাবুবাগানের মন্ডপ, এত ফাঁকা হতে শেষ কবে দেখেছি? এটুকু নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি করোনার সময়েও এর থেকে খানিক লোক বেশি ছিল। তাহলে কি আমিও বলব যে, এ বছর ঠিক পুজো-পুজো মনে হচ্ছে না?
না তো।
কোথায়?
তোর সাথে সেই পুজোয় একসাথে থাকার অনুভবগুলোকে তো এই 'শ্রাবণ দিনে' এড়ানো গেল না! আমরা শ্রেয়া ঘোষালের প্রোগ্রাম শুনতে নিকো পার্ক লনে গিয়েছিলাম, মনে আছে?
হ্যাঁ। তোর তো মনে থাকবেই।
অন্তত ২০২৪-এ 'আমার শ্রাবণ দিন যখন আমায় একা রেখে চলে যাচ্ছিল' ব্যাঙ্গালোরের একটা রাতে, সেদিন যখন শেষ বার আমার আর তোর কথা হয়েছিল, তখনও তুই সেটাই বলেছিলিস। "জাদু হ্যায়, নশা হ্যায়" – শ্রেয়া ঘোষাল অনুষ্ঠানে প্রথম গেয়েছিলেন সেদিন। না, ওঁর সমস্ত অনুষ্ঠানের কথা বলছি না। আমাদের জন্য প্রথম গেয়েছিলেন। আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম স্ট্যান্ডিং সেকশনে। কাকিমা ঘাসের ওপর বসে; খানিকটা পেছনের দিকে। ভীড় ছিল। তবে আমার গায়ে এলিয়ে পড়ার মতো ছিল না– এটা তুইও জানিস আমিও জানি। তাহলে? কেন এড়িয়ে পড়তে হল তোকে? হাতের ওপর হাত রাখাটা এতই সহজ? সে রকমই ভাবতিস। আর আজও ভাবিস। তাই না?
সারা জীবনের মত আমাকে একা করে দিয়ে এভাবে চলে যেতে আছে?
আমার তাই তোদের মত কাউকে আজকাল প্যাণ্ডেলে দেখতে ইচ্ছে করে না। কী লাভ? "এক্সকিউজ মি। আপনি কি একা? আমাদের একটা ছবি তুলে দেবেন?" – বিশ্বাস কর ; এইসব অনুরোধ গালে আজকাল গালে একটা সপাটে থাপ্পড়ের মতো লাগে! তাই এর ওষুধ নিপাট প্রত্যাখ্যান নয়, বরং সম্পূর্ণ ও রুঢ় প্রত্যাখ্যান।তাতে আমি খানিক বেঁচে যাব। বেঁচে যাওয়ার জন্যই তো সকালে একটু সাউথ সিটি আইনক্সে একেন বাবু দেখা। পুজোয় ফার্স্ট ডে-ফার্স্ট শো দেখছি – নিজেকে এইসব বুঝিয়ে, হাসতে হাসতে ঘন্টা দুয়েক কাটিয়ে, খানিক বেঁচে নিলে যদি ভালো হয়, সেটা কি খুব অন্যায় হবে? একটু কাজু-কিসমিস পোলাও আর কষা মাংস খেতে খেতে যদি মনে হয়, আমাদেরও সাউথ সিটি ফুডকোর্টে বসে এই খাবারটা খাওয়ারও সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু সেদিন "চেয়ে দেখো মেঘেরা ছুঁয়েছে মেঘলা মন", মনোময়ের এই গানটুকু শুনিয়ে আর তোর আঙুলে একটা চুমু খেয়ে আমি স্রেফ উঠে গিয়েছিলাম – এটা কি আমার পাপ?
আর সেই জন্যেই কি সামান্য ছবি তুলে দেওয়ার ভয়ে আমাকে আজও প্যান্ডেল থেকে প্যান্ডেলে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে এই পঞ্চমীর 'শ্রাবণ দিনে'?
আমাদের পুজোর স্মৃতি আসলে এক একটা গানের সুর, একেকটা হাতের সামান্য হতে-পারা বা হতে-না-পারা ছোঁয়া, এক একটা দোকানে একসাথে খাওয়ার বা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে রোল বা ঘটি গরম, চাট, ফিস ফ্রাই আর কোলড ড্রিংস দিয়ে ম্যানেজ করার, আর প্যান্ডেলে আকণ্ঠ প্রণাম-প্রার্থনা যাতে সারা জীবন দুজনে একসাথে থাকতে পারি – তার স্মৃতি। সেইসব প্রার্থনা কখনও কখনও কারো জীবনের সত্যি হয়, কারো জীবনে হয় না। কিন্তু তাই বলে আমাদের পঞ্চমীর মনের আদর নষ্ট করে দেবে এমন শক্তিধর মহিষাসুর কি জন্মেছে? মনে তো হয় না। চণ্ডীর মা কিন্তু ওঁকে শূলে বিদ্ধ করেন নি। গলাটা স্রেফ খাঁড়া দিয়ে কেটে দিয়েছিলেন।
আমাদের সুরের গলাটা কে কাটবে বল?
আমরা তো এতদিন পরেও, এত বহির্ভূত সম্পর্কেও কেউ কারো জীবনে তেমন অসুর হয়ে উঠতে পারলাম না!




Comments
Post a Comment