আলো তীব্রতর হয় ষষ্ঠী চলে এলে। পুজোর আমেজ হয়ে ওঠে তীক্ষ্ণ, আরো তীক্ষ্ণ। পাড়ার প্যান্ডেলে একটু একটু করে 'ফুটফল' বাড়তে থাকে। দুটো হাত আরো জোরদার হয় – তা সে প্রণামের হোক বা আঁকড়ে ধরে থাকার।
এ বছর মনে হচ্ছে পুজো ভালো কাটবে। খানিক আরামে ঘোরা যাচ্ছে। এই নিয়ে দুটো বাংলা সিনেমা দেখা হয়ে গেল। খুব আহামরি কিছু নয়, তবে পুজো কিনা? এটুকু করা যায়। আর পেট পুজো হচ্ছে জমিয়ে।
ষষ্ঠীর সন্ধে নামতেই চারপাশের ওই তীব্র আলো আর মাইকের গমগমে আওয়াজ হঠাৎ ধাক্কা দিয়ে মনে করিয়ে দেয় – দিনগুলো বড্ড দ্রুত গলে যাচ্ছে। প্যান্ডেলের মুখে আলোর রোশনাই যত বাড়ে, মনের ভেতরের অচেনা অন্ধকারটাও কি ততটাই গাঢ় হতে থাকে? হয়তো বা।
তবে এবার ভিড়ের মধ্যে সেই চেনা অস্থিরতাটা কেমন যেন উধাও। আগে কত কী চাওয়ার থাকত – নির্দিষ্ট কারও উপস্থিতি, একটা সূর্যোদয়ের মত সাক্ষাৎ, কিংবা নিখুঁত কোনো ষষ্ঠীর সন্ধে। এখন বুঝতে পারি, এই 'আহ্বান' পর্বটাই আসলে আসল। এটাই তো ষষ্ঠীর prologue.
ছবি দেখা বা রেস্তোরাঁয় খাওয়ার এই যে ছোট ছোট ফাঁকিগুলো দিয়ে নিজেকে ভুলিয়ে রাখা – এটাও তো এক ধরনের আত্মরক্ষা। মানুষ আসলে সারা বছর ধরে এই কয়েকটা দিনের জন্যই একটা কল্পনার জগত তৈরি করে। আর ষষ্ঠীর রাতে এসে যখন বোধন হয়, তখন হঠাৎ টের পাওয়া যায়, দেবীর চোখের মতো আমাদের জীবনটাও কিছুক্ষণের জন্য জ্যান্ত হয়ে উঠেছে।
রাত বাড়লে যখন ঢাকের আওয়াজ একটু নিস্তেজ হয়ে আসে, আর রাস্তায় ভিড় কমতে শুরু করে, তখন মণ্ডপের এক কোণে দাঁড়িয়ে থিমের ওই ঝকঝকে সাজসজ্জার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কাঠের খাঁচাটার দিকে চোখ যায়। আসল গঠন তো ওটাই। আমাদের জীবনের কাঠামোটাও কি ওই কাঠের মতো নয়? ওপরে রঙের প্রলেপ দিয়ে আমরা উৎসব পালন করি, আর ভেতরে একা একা গান শুনি। তবু, আজ ষষ্ঠীর রাতে সেই একাকীত্বকে আর অসুখ বলে মনে হচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে, এই বেশ ভালো – আলোর তীব্রতায় নিজের ছায়াটাকে অন্তত স্পষ্ট দেখতে তো পাওয়া যাচ্ছে!
১৬ অক্টোবর, ২০২৬
Comments
Post a Comment