Skip to main content

তৃতীয়া

এ বছর তৃতীয়া হতেই দেখি বেশ কিছু পুজো সংখ্যা পড়া হয়ে গেছে। ভালো লাগে। Binod Ghoshal -র 'তুমি কি আমার গোলাপ হবে?' বা অনুপম মুখোপাধ্যায়-র 'চাঁদের চেয়ে দূর' - কী ভালো দুটো লেখা! এরাই আমার পুজো। আমার লিখতে শেখার অঞ্জলির ফুল। বই শুধু পরে না থেকে যদি মাঝেমাঝে পড়া হয়ে যায়, তখন মনে হয়, একটা মনের মত কাজ অন্তত হল। অনেকে শুনেছি, ছোট থেকেই বেশ এক মাস ধরে তারিয়ে তারিয়ে এই পুজো সংখ্যাগুলো পড়েন। তাতে তাঁরা আরও এক মাস আগের থেকেই বুঝতে পারেন, পুজো আসছে। অপেক্ষা করেন। স্রেফ অপেক্ষা।

আজকাল কেউ কি কারও জন্য অপেক্ষা করে? কেউ কি কিছুর জন্য অপেক্ষা করে? চটজলদি পাঁচ মিনিটে বাড়িতে আসে নিত্যপ্রয়োজনীয়র সাথে অফারের লোভে অনেক অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। ভাবি সাশ্রয় হবে, কিন্তু এই অপেক্ষাহন্তারক সিস্টেমটি এমনভাবেই তৈরি হয়েছে যে, আমাদের খরচ বাড়াতেই তার মোক্ষ -- আমাদের অপ্রয়োজনীয়কে সে বুঝিয়ে দেয় আবশ্যিক, আর লাক্সারীকে করে তোলে নিতান্ত প্রয়োজনীয়।

এই সেদিনই এক প্রিয় অভিনেত্রী বিজ্ঞাপনে বলছিলেন – আপনিও যদি আমার মত মনে করেন যে জল আরও ‘ইয়াম্মি’ হতে পারে, তাহলে এই ফ্রুট ওয়াটারটা আজ থেকেই জলের বিকল্প হিসেবে খাওয়া শুরু করুন। সীমিত সময়ের জন্যে একটা কিনলে পেয়ে যাবেন আরেকটা বিনামূল্যে। আর শুধু তাই নয়, এখানে রয়েছে ভিটামিন বি১২, আরো অনেক কিছু, এবং এই জন আপনার শরীরের ইলেক্ট্রোলাইটের পরিমাণ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।

পুজোয় একা? ঘোরার সঙ্গী নেই? ঘোরা ক্লান্তিকর হতে পারে। কিন্তু, মুভি দেখা? সাউথ সিটি রিয়াসতে লাঞ্চের সাথে ককটেল বা সোডা বটল ওপেনারওয়ালাতে এই পুজো পুজো আবহটাকে একটু চাগিয়ে নিতে সামান্য ড্রিংক্স আর পরে বেরি পোলাও আর সাথে যে কোনো পার্সি সাইড? আইডিয়াটা তো ভালো, কিন্তু একা? কুছ পরোয়া নেহি। পছন্দের মত বন্ধুর সাথে এখন ঘন্টা প্রতি কিছু খরচে আপনি নিজের সমস্ত শেয়ার করতে পারেন, আড্ডা দিতে পারেন, মুভি দেখতে পারেন, কোথাও খেতে যেতে পারেন। পুজোতে বন্ধুত্বের জন্য অপেক্ষা, তারপর তার না না ফ্রাস্ট্রেশনের কথা শোনা, এই খাব না – ওখানে যাব না, আরো বিবিধ ট্যান্ট্রামস্‌, পুজোর মরশুমে কিস্‌ লিয়ে বস্‌? তবে হ্যাঁ, শুধু বন্ধুত্ব-ই ভাড়া পাওয়া যাবে কিন্তু। অন্য কিছুর খোঁজ করতে হলে, এই সার্ভিস প্রোভাইডাররা তাতে অপারগ।

পুজো এবছর তাই অনেক সোজা এবং অনেকটাই বাজারকেন্দ্রিক অর্থনীতির অনুগ। তাতে একটা সুস্থ লেনদেন যতক্ষণ হচ্ছে, ততক্ষণ পুজোটা বেশ। সুইগি এবার পুজোয় শুধু খাবারই পাঠাচ্ছে না, ভোগ পাঠাচ্ছে। পাড়ায় ভোগ খেতে যেতে ইচ্ছে করে না? অথচ, ইন্সটায় পুজোর অঞ্জলির ফুলের, প্রসাদের, ভোগের ছবি দেওয়া আবশ্যিক? উপায় আছে। দ্বিতীয় সপ্তমী আর অষ্টমীতে আপনি আপনার আশপাশের সেরা পুজোর মণ্ডপ থেকে ভোগ, ফুল, প্রসাদ, ও মায়ের একটা মুখ পেয়ে যাচ্ছেন এ বছর ঘরে বসেই। হ্যাঁ, সুইগি খুলুন আর পুজোর ভোগ এই তৃতীয়া-চতুর্থী থাকতে থাকতেই প্রি-বুক করে নিন।

মোট কথা, পুজো এসে গেছে গাইজ। অতএব, অপেক্ষা ছাড়ুন। পুজো সংখ্যা কিনে ছবি দিতে পারেন, কিন্তু ওসব পড়াটড়া ছাড়ুন।

কিছুই করবেন না। ল্যাদ খান। বিরিয়ানী আনান। স্কচ, ভদকা, ব্রিজার – কিছু একটা আনান। অনলাইনে পুজো দেখুন। আর পুজোর কয়েকটা দিন কেটে গেলে আফসোস করুন যে পুজোটা এখন আর আগের মত আসে না।

ব্যাস্‌।

১৪ অক্টোবর, ২০২৬

Comments

Popular posts from this blog

অনাদায়

  ১। যে আঁচেতে পুড়ে যাওয়া একটু একটু করে, সে আগুন তোমার তো নয় জানি। তবে? বসুধা কুটুমবাড়ি, অতএব পুড়ে যেতে হবে। কোথায় জ্বলছে পেট, কোথায় চাকরি, বাড়ি, যেদিকে তাকাই সবাই ছুট্টে আসে, জন্মপঞ্জি নিয়ে। মা বাবার পরিচয় চায়। ওরা বলে, দেখছ না? একই তো পেটের ফল। আর বল্‌, পাপ নিবি কি না? এই পাপ আমাদের একা করে কোন খাদে নিয়ে যাবে, এখনও জানি না।       ২। এমন করলে কেন? বুঝেছিলে মৃত্যু আসীন? এ প্রশ্নে একটি রক্তবাণ বিদ্ধ করে, সমস্ত দিন, সমস্ত রাত নির্ঘুম। দিনে রাতে পেয়াদার ডাক, আড়ং ধোলাই আসে আকাশকুসুমে, থাক থাক, আর মেরো না খোদাতালা, প্রভুর দাসেরে। বল সুবিনীত হবে? হব, তবে তোমার জন্যে এই টক্সিক উপোস-কানুন নেশা জানিনা কিচ্ছুটি, শেষ হবে কবে।     ৩। নিজের দূরাত্মীয়, সেই হল এখন প্রথমা। ভেবেছিলে সেটাই দায়িত্ববোধ। একবার হাত পাতলে সেই হাত ফিরে ফেরে, সেটা জানতে না বুঝি? বলেছিল তোমার আত্মজ। আসল আত্মীয় কে? অন্য কেউ? দুরাত্মা? জারজ?     ৪। এটুকু কিছুই নয়। ঢের বাকি আছে। সামাজিক অপমান , পুলিশ , আদালত , পাড়াছাড়া। র...

পাড়া ক্রিকেট

  নিয়ে আয় খেলোয়াড়ি বল, উড়ুক তুফানে উইকেট‌; আগেভাগে পিচটিচ ঠিক কর তোরা – আমার উদ্যানে। বাড়ির সামনে চেঁচা উত্তাল - "ভাই, ভাই ওটা পায়ে‌ লেগেছিল", ভেঙে ফ্যাল আমাদের নিশ্চুপ পাড়ার বিকেলঘুম, নিজের দিকেতে শাসানির চারটে আঙুল, আর বিরুদ্ধতার তর্জনী। আমাদের শীতকাল, বয়স বিরুদ্ধতা জুড়িয়ে উঠুক, জুড়িয়ে উঠুক সব বন্ধুতা বিচ্ছেদ, চাকরির অপলাপ এইচ-আর সালিশী সভা; আর জুড়িয়ে তুবড়ে দে, দে তো‌ দেখি, হিংসুটে দৈত্যের বাগানেতে অপ্রতিম কাঁটাগাছ, আর ভেতরেতে নুয়ে পড়া করুণ জবা। মধ্যবয়সে যারা বুড়ো ভাম, ভীমরতি প্রাপ্তির সামান্য দূরে – এটুকু মানতে পারি, আমাদের বাপ, মা, কাকারাই পাড়ায় পাড়ায় আদরে, বেনামে, কালো টাকা আর সবুজ উদ্যানে, ফেলেছে সিন্ডিকেট, নির্মিয়মাণ ফ্ল্যাট, ফণীমনসার কাঁটা বেড়ার স্তবক। এখন বিকেল হল। আমার পাড়াকে তোরা টেনে আন উদ্যানে। আমাদের আওয়াজের ভদ্রতা ভয়টুকু ব্যাটেতে, বলেতে নাচা- "আউট, আউট"। শেখা ঢের বাকি আছে নীতি বা সবক। ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

বাগানবিলাস

  তোমার সমস্ত উত্তরের সামনে নিশ্চুপ হয়ে বসি। এই দেখেছ বাগানে নিম তুলসি এই দেখো না মৌটুসী মেনে নেয় কেমন ফুলকপির ডাঁটে গড়ে ওঠে নিস্তব্ধ জবা। তোমার খোলা বুকের ফোঁটার দিকে তাকিয়ে থাকি আর মনে হয় এবছর শেয়ারবাজারে সারের ফলন হবে ভালো।